দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়, মাছের উৎপাদন ও মৎস্যসম্পদের প্রকৃত চিত্র জানতে দীর্ঘদিন পর নতুন করে জরিপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশে মাছ ও পুকুর নিয়ে সর্বশেষ শুমারি হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। প্রায় চার দশকের বেশি সময় পর তথ্য হালনাগাদে ৩১ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ—২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা—রাখা হয়েছে পরামর্শক খাতে। প্রচলিত জরিপকাজের জন্য এত বিপুল অর্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদেরা।
‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মৎস্যসম্পদের জরিপ পদ্ধতির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও মৎস্যসম্পদের তথ্য সংগ্রহ, জরিপ পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা। কিন্তু ৩১ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রকল্পে ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখায় ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পের নথিতে ‘দ্য ডেভেলপমেন্ট, মডার্নাইজেশন অ্যান্ড আপগ্রেডিং অব দ্য ফিশারিজ রিসোর্স সার্ভে সিস্টেম’ খাতের আওতায় এই অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে এটি বাস্তবায়ন করবে মৎস্য অধিদপ্তর।
১৯৮৩ সালের পর নতুন করে মাছ ও পুকুরের শুমারি
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের পুকুর, খালসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের জন্য এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জরিপের মাধ্যমে জলাশয়ের অবস্থান, আয়তন, মাছের উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ এবং মৎস্যজীবীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলাশয়গুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং করা হবে।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মৎস্যচাষ) মো. আলমগীর কবীর জাগো নিউজকে বলেন, দেশে পুকুর, খালসহ প্রায় ৩০ লাখ স্পট রয়েছে। এসব জলাশয়ের তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদ করা হবে। ১৯৮৩ সালের পর এ ধরনের শুমারি হয়নি। তাই এবার জিআইএস পদ্ধতিতে ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদের তথ্য আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যে মৎস্যসম্পদ আছে, তার জিআইএস ম্যাপিং হবে। জরিপের পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা হবে। গবেষণার কাজ করতে একটি ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হবে। সমগ্র বাংলাদেশে ২৩ থেকে ২৪ লাখ পুকুর ও খাল রয়েছে। সব তথ্য হালনাগাদ করা হবে। মাছের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পুকুর শুমারিও করা হবে।’
পরামর্শক খাতের ব্যয় প্রসঙ্গে আলমগীর কবীর বলেন, পুকুর-খালসহ প্রায় ৩০ লাখ স্পটের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সেই বিবেচনায় পরামর্শক ব্যয় কমই ধরা হয়েছে। টেন্ডারের মাধ্যমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
তার ভাষ্য, এই জরিপের মাধ্যমে মাছের উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য আরও নির্ভুল করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জলাশয়, মাছ ও মৎস্যজীবীদের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পরিকল্পনায় কাজে আসবে।
কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে
প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরামর্শক খাতে। ৩১ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রকল্পের মধ্যে এ খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট বরাদ্দের বড় অংশই যাবে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য।
এ ছাড়া বাড়িভাড়া ও ভাতা খাতে ২৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা, উৎসব ভাতায় ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বেতন বাবদ ১৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একটি জিপ গাড়ি ভাড়া বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ টাকা।
ডকুমেন্টেশন, ডিভাইস, স্পিডবোট ও ট্রলার ভাড়া এবং ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন খাতেও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। টিওআর ও টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুত, পরিদর্শন, মনিটরিং, সুপারভিশন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় বাবদ রাখা হয়েছে ২০ লাখ টাকা। সেমিনার ও কনফারেন্স, কেন্দ্রীয় কর্মশালা, বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা এবং তথ্য যাচাইয়ের কাজে বরাদ্দ রয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া জনপ্রতিনিধি, মাছচাষি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে অবহিতকরণ কার্যক্রমের জন্য দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের অন্যান্য খাতে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের পাশাপাশি পরামর্শক খাতে বিপুল অর্থ রাখার বিষয়টি নিয়েই মূলত প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদের
মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব জনবল ও কারিগরি দক্ষতা থাকার পরও জরিপ প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি।
জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টে অনেক এক্সপার্ট আছে। যথেষ্ট টেকনিক্যাল এক্সপার্টাইজও আছে। কাজেই এত বেশি পরামর্শক ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ৩১ কোটি টাকার প্রকল্পে ২৩ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় মানে অনেক বেশি।’
তিনি বলেন, পরামর্শক খাতে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা ভালোভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ যদি পরামর্শক খাতেই চলে যায়, তাহলে মূল জরিপ ও মাঠপর্যায়ের কাজের জন্য কতটুকু অর্থ অবশিষ্ট থাকবে, সে প্রশ্নও থেকে যায়।
মুস্তফা কে মুজেরির মতে, মৎস্য অধিদপ্তরে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দক্ষতা থাকলে তাদের সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন এত বড় অঙ্কের অর্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করতে হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, পরামর্শক ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য সুফল যাচাই করা জরুরি।
জরিপের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যয়ের স্বচ্ছতা জরুরি
দেশের মৎস্যসম্পদের প্রকৃত অবস্থা জানতে দীর্ঘদিন পর নতুন করে জরিপের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জলাশয়ের অবস্থান, আয়তন, মাছের উৎপাদন ও মৎস্যজীবীদের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া গেলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে তা সহায়ক হতে পারে।
তবে জরিপের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মোট বরাদ্দের বড় অংশ পরামর্শক খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে কাজের পরিধি, জনবল, প্রযুক্তি, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং প্রত্যাশিত ফলাফলের বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব দক্ষ জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা কতটুকু কাজে লাগানো হচ্ছে এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের মাধ্যমে কী ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে—তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, কার্যকর তদারকি এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হবে। অন্যথায় মাছ ও পুকুরের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগেও ব্যয়ের বড় অংশ মূল কাজের পরিবর্তে পরামর্শক খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

