জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কার ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ এবার সংসদে গড়াতে যাচ্ছে। আগামী ৯ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে এনবিআরকে দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার বিল উত্থাপিত হতে পারে। এ লক্ষ্যে সরকারের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের একটি কমিটি এনবিআরকে পৃথক দুটি বিভাগে বিভক্ত করার সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত বিভাগ দুটি হলো—‘রেভিনিউ পলিসি ডিভিশন’ বা রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং ‘রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন’ বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ৯ নভেম্বরের সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, রাজস্ব নীতি বিভাগ দেশের করনীতি প্রণয়ন, রাজস্ব কৌশল নির্ধারণ এবং করসংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ রাজস্ব আদায়, কাস্টমস কার্যক্রম, কর প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে করনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রস্তাবিত বিভাজনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ এবং রাজস্ব সংগ্রহের প্রশাসনিক দায়িত্ব পৃথক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজস্বনীতি প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ এবং সেই নীতি বাস্তবায়নকারী প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দায়িত্বের বিভাজন স্পষ্ট হবে। এতে জবাবদিহি বাড়ানো, প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কেন এনবিআর পুনর্গঠনের উদ্যোগ
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে দীর্ঘদিন ধরেই এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারের আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও উন্নয়ন সহযোগীরাও রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব পৃথক করার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। পৃথক কাঠামো গঠন করা গেলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা এবং বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, করদাতাদের সেবা সহজ করা এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও সংস্কারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় ভূমিকা
এনবিআরের প্রস্তাবিত বিভাজন কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে বিল উত্থাপনের পর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংসদে পাস ও প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরই আইনগতভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর করার পথ তৈরি হবে।
তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সংস্কার সম্পূর্ণ হবে না। নতুন দুই বিভাগের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারণ, জনবল বণ্টন, প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি, সম্পদ ও দাপ্তরিক কার্যক্রম হস্তান্তর এবং মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রাজস্ব ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসতে পারে
এনবিআর বিভাজনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে করনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব আলাদা হওয়ায় দুই বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং জবাবদিহির নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে।
তবে সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে নতুন কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল নিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার ওপর। একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি কমানো, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানোই হবে এই সংস্কারের বড় পরীক্ষা।
আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপিত হলে এনবিআরের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও দেশের রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার প্রক্রিয়া নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংসদীয় অনুমোদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর।

