ঢাকা রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

menu

সাফজয়ী অধিনায়ক রজনীকান্তের করুণ জীবন, একসময় দেশের গর্ব—এখন নিভৃতে অসহায়

ক্রিয়া প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১০:০৭ এএম

সাফজয়ী অধিনায়ক রজনীকান্তের করুণ জীবন, একসময় দেশের গর্ব—এখন নিভৃতে অসহায়

ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছিল বাংলাদেশ। মাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে বুক চিতিয়ে লড়েছেন, রক্ষণভাগে ছিলেন দলের নির্ভরতার প্রতীক। ২০০৩ সালের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতানোর পেছনে যাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, সেই অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মন আজ নিজেই জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত। একসময় দেশের ফুটবলের গর্ব হয়ে ওঠা এই সাবেক ফুটবলার এখন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অনেকটা নিভৃতে, অসুস্থতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার সক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও পায়ে রয়ে গেছে স্থায়ী শারীরিক সীমাবদ্ধতা। বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না, একা কোথাও যেতেও পারেন না। ফলে কাজ করে আয় করার সুযোগও নেই। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতায় অনেকটা ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন ২০০৩ সাফজয়ী দলের এই অধিনায়ক।

গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক ধরে এগিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের পিঙ্গাবহ গ্রামে তাঁর বাড়ি। শালবনের বুক চিরে যাওয়া এই সড়কটি যেমন দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আলোচনায়, তেমনি গ্রামের ভেতরে রজনীকান্তের বাড়ির সামনের রাস্তাটিও বৃষ্টির দিনে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষের চলাচলের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

দুর্ঘটনার পর বদলে গেছে জীবন

বছর পাঁচেক আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন রজনীকান্ত বর্মন। দুর্ঘটনায় তাঁর পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসায় পা কেটে ফেলতে না হলেও আগের মতো হাঁটার সক্ষমতা আর ফিরে পাননি। এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অল্প কিছুটা চলতে পারেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা বসে থাকাও তাঁর জন্য কষ্টকর।

দুর্ঘটনার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই জীবনে নেমে আসে আরেকটি শোক। দুর্ঘটনার কিছুদিন পর স্ত্রীকে হারান তিনি। দুই মেয়ে বর্তমানে ভারতের হুগলি জেলায় নানাবাড়িতে থাকে। পড়াশোনা ও অন্যান্য ব্যস্ততার ফাঁকে ছুটিতে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে এসে বাবাকে দেখে যায়।

একসময় মাঠের লড়াইয়ে যিনি ছিলেন দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী, সেই রজনী এখন নিজের কষ্টের কথা সহজে কাউকে বলতে পারেন না। নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জানান, জীবন এখন শুয়ে-বসে কাটে। হাঁটতে পারেন না, বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না, কোথাও যেতে পারেন না। কাজ করতে না পারায় আয়ের পথও বন্ধ। অথচ সংসার চালাতে হলে আয়ের প্রয়োজন।

তাঁর ভাষায়, বুকভরা যন্ত্রণা থাকলেও তা সবাইকে বলা যায় না। নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই রাখতে হয়।

২০২৩ সালে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র

২০২৩ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রজনীকান্ত বর্মনের দুরবস্থার খবর প্রকাশিত হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁকে ৩০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়। ওই সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসে পাওয়া মুনাফা দিয়েই বর্তমানে তাঁর সংসারের খরচের বড় অংশ চলে।

তবে পাঁচজনের সংসার চালানোর জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নতুন করে কাজ বা আয়ের কোনো ব্যবস্থা করতে পারছেন না। ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাই তাঁর প্রধান ভরসা।

সম্প্রতি সাবেক দুই ফুটবলার ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব ও মঞ্জুরুল করিম মঞ্জুর উদ্যোগে একসময়কার সতীর্থ এবং বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে রজনীর। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী তাঁর খোঁজখবর নিয়ে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা জানতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে সংকোচের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের প্রয়োজনের কথা খুলে বলতে পারেননি রজনী। কিছুটা সময় নিয়েছেন। নকীব ও মঞ্জু তাঁর জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করছেন।

বাফুফে ও সাবেক ক্লাবগুলোর সহায়তা পাননি

দীর্ঘদিন দেশের ফুটবলে অবদান রাখার পরও দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কিংবা যেসব ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, সেগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নে রজনীর উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, ‘না।’

শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত সংকটের কারণে দেশের ফুটবলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিজেকে আড়াল করে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দুর্ঘটনার পর সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কিংবা আগ্রহ কমেনি। যে ফুটবল তাঁকে পরিচিতি, সম্মান ও জীবনের অনেক স্মৃতি দিয়েছে, সেই খেলা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। নিজের ওপরই বরং অভিমান বেশি।

২০০৩ সাফের সেই স্মৃতি আজও চোখ ভেজায়

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ একটি স্মরণীয় অধ্যায়। অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের অধীনে সেবার দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে বাংলাদেশ। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন রজনীকান্ত বর্মন। পুরো টুর্নামেন্টে রক্ষণভাগে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তিনি। দুই হলুদ কার্ডের কারণে ফাইনালে খেলতে না পারলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন এই ডিফেন্ডার।

এর আগে ১৯৯৯ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলেরও সদস্য ছিলেন তিনি।

২০০৩ সালের ফাইনালে খেলতে না পারার স্মৃতি এখনো তাঁকে আবেগাপ্লুত করে। দল ঘোষণার পর কোচ জর্জ কোটান তাঁকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড সতীর্থ হাসান আল মামুনের হাতে তুলে দিতে বলেন। আর্মব্যান্ড দেওয়ার সময় বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘দেশের ভার কিন্তু তোর ওপরে দিলাম।’ কথাটি বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

ফাইনালে খেলতে না পারার কষ্ট থাকলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বীকৃতি আজও তাঁকে গর্বিত করে। বিশেষ করে তিনি ছিলেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড়, গোল করাই যাঁর মূল দায়িত্ব ছিল না। তারপরও পুরো টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে সেরার পুরস্কার পাওয়া তাঁর কাছে বিশেষ অর্জন।

নতুন সাফ নিয়ে আশাবাদী রজনী

দেশের মাটিতে আরেকটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের আগে জাতীয় দলকে নিয়ে আশাবাদী রজনীকান্ত বর্মন। তাঁর মতে, এবার নিজেদের মাঠে খেলার সুবিধা, দর্শকদের সমর্থন এবং হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি দলকে বাড়তি শক্তি জোগাবে।

তবে শুধু ভালো খেলা নয়, শিরোপা জেতার মানসিকতা ও সাহসও থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, বাংলাদেশ এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে দেশের ফুটবলে নতুন প্রাণ ফিরবে। দর্শক আবার মাঠমুখী হবে, নতুন প্রজন্ম ফুটবলে অনুপ্রাণিত হবে এবং ভালো খেলোয়াড় তৈরির পথ আরও প্রসারিত হবে।

রজনীর কাছে ফুটবলের সাফল্য শুধু একটি ট্রফি জয়ের বিষয় নয়; এটি দেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে জড়িত। তাই দীর্ঘদিন পরও জাতীয় দলের সাফল্যের প্রত্যাশা ছাড়েননি তিনি।

মাঠে ফিরতে চান, কিন্তু শরীর সায় দেয় না

২০০৩ সালের সাফজয়ী দলের অধিনায়ক হয়েও দুর্ঘটনার পর থেকে বাফুফের কাছ থেকে যথাযথ খোঁজখবর বা বিশেষ কোনো সম্মাননা পাননি বলে জানিয়েছেন রজনী। আসন্ন সাফে তাঁকে যদি টিকিট দেওয়া হয় এবং মাঠে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে যাবেন কি না—এমন প্রশ্নে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলেন, হাঁটতে পারেন না, দীর্ঘক্ষণ বসেও থাকতে পারেন না। তবু টিকিট পেলে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে।

কথা শেষে ঘরের ভেতর থেকে ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কারটি নিয়ে আসেন রজনীকান্ত। পুরস্কারটির গায়ে জমে থাকা ধুলো গামছা দিয়ে পরিষ্কার করেন। এরপর দুই হাতে তুলে ধরেন নিজের জীবনের অন্যতম গৌরবময় অর্জনের স্মারক।

সেই মুহূর্তে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে এক চিলতে গর্বের হাসি। পুরস্কারটি যেন মনে করিয়ে দেয়, একসময় এই মানুষটিই ছিলেন দেশের ফুটবলের অন্যতম নায়ক। অথচ আজ তাঁর জীবন কাটছে নিভৃতে, শারীরিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।

রজনীকান্তের বাড়ি থেকে ফেরার সময় প্রতিবেশীরাও তাঁদের এলাকার দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে বাড়ির সামনের রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে বৃষ্টির দিনে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সুস্থ মানুষেরই যেখানে হাঁটতে কষ্ট হয়, সেখানে শারীরিকভাবে অসুস্থ রজনীর জন্য পরিস্থিতি কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।

একসময় যিনি দেশের জন্য মাঠে লড়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছেন, তাঁর জীবনের এমন বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাবেক তারকাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার? রজনীকান্তের মতো জাতীয় গৌরব বয়ে আনা একজন সাবেক অধিনায়কের জন্য প্রয়োজন শুধু সাময়িক সহানুভূতি নয়; প্রয়োজন নিয়মিত খোঁজখবর, সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা এবং তাঁর শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তার ব্যবস্থা।

২০০৩ সালের সাফজয়ের স্মৃতি বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আজও অমলিন। সেই দলের অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মনের হাতে থাকা টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কারও তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু সেই গৌরবের পাশে আজ যে অসহায় জীবন দাঁড়িয়ে আছে, তা দেশের ফুটবল অঙ্গনের জন্যও এক গভীর বেদনার ছবি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!