ফুটবল ইতিহাসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আলোচনা যেন থামছেই না। পর্তুগিজ এই মহাতারকার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় ছিল ২০০৮ সাল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ওই বছর প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন তিনি। এবার ভক্তদের ভোটে সর্বকালের সেরা ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম নির্বাচনের একটি আয়োজনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন রোনালদো।
ইয়াহু স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যালন ডি’অরের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত ‘বেস্ট অব অল টাইম’ বা ‘বোট’ (BOAT) ভোটাভুটিতে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এই ভোটে তিনি পেয়েছেন মোট ভোটের ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে, লিওনেল মেসির ২০১২ সালের মৌসুম পেয়েছে ৯ শতাংশ ভোট। ফলে দুই তারকার মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশ পয়েন্টে।
তবে এটি ভক্তদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি অনলাইন ভোটাভুটি; কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যালন ডি’অর পুরস্কার নয়। আয়োজনে সমর্থকদের অর্থের বিনিময়ে একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভোটের ফলাফলকে ভক্তদের পছন্দের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়, তবে এটিকে সর্বকালের সেরা মৌসুমের চূড়ান্ত বা নিরপেক্ষ পরিমাপ বলা যায় না।
২০০৮ সালে রোনালদোর অবিশ্বাস্য সাফল্য
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ২০০৭-০৮ মৌসুম ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। সে সময় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—দুই প্রতিযোগিতাতেই অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন তিনি।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ওই মৌসুমে ৪২টি গোল করেন রোনালদো। তাঁর গোল, গতি, ড্রিবলিং, হেডিং এবং আক্রমণে ধারাবাহিক অবদান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওই মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতে। পরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে চেলসিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ইউরোপসেরার মুকুটও জেতে দলটি। ফাইনালে রোনালদো গোল করেছিলেন, যদিও টাইব্রেকারে তাঁর শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন চেলসির গোলরক্ষক পেত্র চেক।
ক্লাবের হয়ে এই সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনেও এগিয়ে ছিলেন রোনালদো। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সর্বোচ্চ গোলদাতাদের স্বীকৃতি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতেন তিনি। একই বছর প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন।
ভোটে মেসির ২০১২ সালের মৌসুম দ্বিতীয়
ভক্তদের ভোটে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে লিওনেল মেসির ২০১২ সালের পারফরম্যান্স। ওই বছরে বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন তারকা ক্যালেন্ডার বছরে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৯১টি গোল করে বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পুরুষদের ফুটবলে এক ক্যালেন্ডার বছরে গোলের এই রেকর্ড তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত কীর্তি।
২০১২ সালে মেসি ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিক গোল করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর অসাধারণ গোলসংখ্যা, বল নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণাত্মক দক্ষতা ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তবে ২০০৮ সালের রোনালদোর মৌসুমের তুলনায় ভোটাভুটিতে অনেক পিছিয়ে ছিলেন তিনি।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেসির ২০১২ সালের মৌসুম পেয়েছে ৯ শতাংশ ভোট। রোনালদোর ৭৫ শতাংশের তুলনায় এটি অনেক কম। অবশ্য দুই তারকার কৃতিত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁদের খেলার ধরন, দলের সাফল্য এবং ব্যক্তিগত অর্জনের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
রিয়াল মাদ্রিদে রোনালদোর সাফল্যও আলোচনায়
রোনালদোর ২০০৮ সালের সাফল্য আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে। পরে ২০০৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে ক্লাবটির ইতিহাসে অন্যতম সফল খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন তিনি। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে টানা নয়টি মৌসুম কাটিয়ে গোল ও শিরোপার একাধিক রেকর্ড গড়েন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের পাশাপাশি একাধিক ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য পান তিনি। ক্লাবটির হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা, নকআউট পর্বে পারফরম্যান্স এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান তাঁকে সমর্থকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় ২০১৭ সালে জেতা ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুমটিও আলোচ্য ভোটাভুটিতে জায়গা পেয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই মৌসুম পেয়েছে ৬ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।
এতে বোঝা যায়, ভক্তদের কাছে রোনালদোর ক্যারিয়ারের একাধিক মৌসুমই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে ২০০৮ সালের মৌসুমের প্রতি সমর্থকদের আগ্রহ অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
‘বোট’ ভোটাভুটি কী এবং এর ফল কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
‘বোট’ বা BOAT ভোটাভুটির উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল ইতিহাসের ব্যালন ডি’অরজয়ী খেলোয়াড়দের বিভিন্ন মৌসুমের মধ্যে সমর্থকদের পছন্দের সেরা পারফরম্যান্স নির্বাচন করা। এতে রোনালদো ও মেসির পাশাপাশি ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি এবং রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তিদের মৌসুমও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল।
তবে এ আয়োজন কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বিতরণী নয়। ভোট দেওয়ার পদ্ধতিতে একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকায় ফলাফলকে সরাসরি খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সের তুলনামূলক পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
তবু অনলাইন ভোটে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুমের বিপুল সমর্থন তাঁর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ওই সময়ের অসাধারণ সাফল্যের প্রতি ভক্তদের আকর্ষণ তুলে ধরে।
রোনালদো-মেসি দ্বৈরথে নতুন আলোচনা
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির তুলনা নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। দুজনই একাধিকবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন এবং ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁদের খেলার ধরন আলাদা হলেও ফুটবল ইতিহাসে দুজনের প্রভাবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম ছিল গতি, শারীরিক সক্ষমতা, গোল করার দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে পারফরম্যান্সের এক অনন্য সমন্বয়। অন্যদিকে, মেসির ২০১২ সালের ক্যালেন্ডার বছরের গোলের রেকর্ড তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতা ও ধারাবাহিকতার অসাধারণ উদাহরণ।
ভক্তদের ভোটে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুমের বড় ব্যবধানে জয় তাই নতুন করে আলোচনায় এনেছে দুই কিংবদন্তির সেরা সময়ের তুলনা। তবে ভোটের ফল যাই হোক, দুজনের অর্জনই আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

