ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনা প্রায় শেষ, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন অনিশ্চিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১১:০১ এএম

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনা প্রায় শেষ, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন অনিশ্চিত

ছবিঃ সংগৃহীত

ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফল ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় সরকার গঠন নিয়ে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা গাদি আইজেনকোটের পক্ষেও সরকার গঠনের পথ সহজ নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু নাকি আইজেনকোট—কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোট গণনার বড় একটি অংশ শেষ হলেও সরকার গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধান না এলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানাপোড়েন

ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে কোনো জোটের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। কিন্তু ভোট গণনার প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি, অতি-ডানপন্থি ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর জোট সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারছে না।

বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনার পর ইসরায়েলের তিনটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমের পূর্বাভাসে বলা হয়, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, তাঁর বিরোধী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮।

এ ছাড়া আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই আসনগুলো সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া আইজেনকোটের জোটের সরকার গঠনের বাস্তবসম্মত পথ কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

ইহুদি রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ আরব ইসরায়েলি দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। ফলে বিরোধী জোটের সামনে শুধু আসনসংখ্যার হিসাব নয়, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা কেন

নির্বাচনের ফলাফলে নেতানিয়াহুর জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাঁর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে বিদ্যমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করতে পারে।

এ অবস্থায় নেতানিয়াহু নতুন সরকার গঠিত হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে পারেন। সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তাঁর এই দায়িত্ব পালনের সময় আরও বাড়তে পারে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি নির্ভর করবে ইসরায়েলের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তাই নেতানিয়াহু কত দিন দায়িত্বে থাকবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী

ইসরায়েলের সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেন। এই প্রক্রিয়ায় সরকার গঠনের সম্ভাবনা, পার্লামেন্টে সমর্থন এবং জোটের সমীকরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এরপর সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া নেতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীকে ৪২ দিন সময় দেওয়া হতে পারে। তবে কোনো দল বা জোট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সাংবিধানিক পদক্ষেপের প্রশ্ন সামনে আসে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া এবং নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংযম দেখাবে—এমন প্রত্যাশা থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সরকারটির হাতে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে না।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো গাই লুরির মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা সাধারণ সরকারের মতোই থাকে। তবে এ ধরনের সরকারের ওপর সংযম প্রদর্শনের দায়িত্ব থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।

অর্থাৎ, নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চললেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে। নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযমের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরব দলগুলোর আসন কেন গুরুত্বপূর্ণ

নির্বাচনের প্রাথমিক পূর্বাভাসে আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সম্ভাব্য ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নেসেটে কোনো জোট এককভাবে ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮ হওয়ায় সরকার গঠনের জন্য তাদের অতিরিক্ত সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার বিষয়ে ইহুদি রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের আপত্তি থাকায় সমঝোতার পথ জটিল হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোটও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার গঠনের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে হবে। ফলে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলের পাশাপাশি কোন দল কার সঙ্গে জোট গঠন করছে, সেটিও প্রধানমন্ত্রিত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নতুন নির্বাচন হলে কী হতে পারে

সরকার গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আগে দেশটির সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

নতুন নির্বাচন হলে রাজনৈতিক দলগুলো আবারও ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও যদি কোনো জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে একই ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আবারও দেখা দিতে পারে।

এ অবস্থায় নেতানিয়াহুর অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সম্ভাবনা রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত পরিস্থিতি নির্ভর করবে ভোটের ফল, জোট গঠনের আলোচনা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটের হিসাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতাই এখন সরকার গঠনের মূল নির্ধারক হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহু ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, নাকি আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে—তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায়।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা
 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!