ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায়। উপজেলার আটাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ঘরে দীর্ঘদিন ধরে তালা ঝুলতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ঘর টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আবার জমিজমা ও বসতবাড়ি থাকা ব্যক্তিদের নামেও ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একদিকে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো সরকারি আশ্রয়ের অপেক্ষায় রয়েছে, অন্যদিকে বরাদ্দ পাওয়া কিছু ঘরে কেউ বসবাস করছেন না। এতে সরকারের মানবিক উদ্যোগের সুফল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘরে তালা
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচবিবি উপজেলার আটাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাধিক ঘরে তালা ঝুলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও সেখানে উপকারভোগীরা বসবাস করছেন না। কয়েকটি ঘর অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেসব পরিবারের নিজস্ব জমি বা বসতবাড়ি নেই, তাদের জন্য স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রকল্পের কিছু ঘর অব্যবহৃত পড়ে থাকা এবং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রকৃত ভূমিহীনদের আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে ঘর বিক্রি বা বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাই ছাড়া সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
জমিজমা থাকা ব্যক্তির নামেও ঘর বরাদ্দের অভিযোগ
দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশের দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা ধুলবর রহমান অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্পের কয়েকটি ঘরে কেউ বসবাস করছেন না। অথচ যাদের নিজস্ব জমিজমা ও বাড়িঘর রয়েছে, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ আশ্রয়ণের ঘর পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি রঞ্জিত নামে এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে বলেন, ওই ব্যক্তির গ্রামের ভেতরে বাড়ি রয়েছে এবং তিনি প্রায় চার থেকে পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেন। এরপরও তাঁর নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর বরাদ্দ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন ধুলবর রহমান। তাঁর দাবি, ওই ঘরে কেউ বসবাস করছেন না; সেখানে তালা ঝুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দের ক্ষেত্রে উপকারভোগীদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, জমির মালিকানা ও আবাসনের প্রয়োজন যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েও সমাধান হয়নি, দাবি স্থানীয়দের
দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা রশিদুল হাসান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের সময় তাঁরা সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধ করেছিলেন, যেন যাদের জমি ও বাড়িঘর নেই, তাঁদের অগ্রাধিকার দিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
রশিদুল হাসানের ভাষ্য, এখন প্রকল্পের কোনো কোনো ঘরে মানুষ বসবাস করছেন না, আবার কিছু ঘর বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অথচ এলাকায় এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের থাকার মতো নিজস্ব জায়গা নেই।
স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা পুনরায় যাচাই করা হলে কারা ঘর পেয়েও সেখানে বসবাস করছেন না এবং কারা আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করলেন ইউপি চেয়ারম্যান
আটাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান আ স ম আরেফিন চৌধুরী আবুও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ ও ব্যবহার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিতরণের সময় কিছু ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের ঘর দেওয়া হয়েছে, যাঁদের কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে ঘর অন্যের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কেউ কেউ বরাদ্দ পাওয়া ঘরে বসবাস করছেন না; ঘরগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
চেয়ারম্যানের দাবি, এলাকায় এমন মানুষ রয়েছেন, যাঁরা থাকার জায়গা না থাকায় নিয়মিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে সহায়তা চান। অথচ আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।
তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর
এ বিষয়ে পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাশপিয়া তাসরিন বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ ধরনের ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিন তদন্ত হবে কি না এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রকৃত উপকারভোগীদের আবাসন নিশ্চিত করার দাবি
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে নিরাপদ আবাসন দেওয়া। তাই প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাই, ঘরের প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে কোন ঘরে উপকারভোগীরা বসবাস করছেন, কোনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ এবং বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করে কোনো ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হোক।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অব্যবহৃত বা নিয়মবহির্ভূতভাবে হস্তান্তর করা ঘরগুলো প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরকারের এই আবাসন কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ বরাদ্দপ্রক্রিয়া, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এখন দক্ষিণ কলন্দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

