দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তা, দাফন নিয়ে জটিলতা এবং বাধার অভিযোগের পর অবশেষে দাফন করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হিসেবে পরিচিত মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের একাংশ তাঁকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে মৃত্যুর পরও তাঁর মরদেহ দাফন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
টুঙ্গিপাড়ায় মৃত্যু, মরদেহ নেওয়া হয় পিরোজপুরে
মানিক পশারীর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।

পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মেয়ের জামাতার কাছে আশ্রয় নেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি গত দুই মাস ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
মৃত্যুর পর শনিবার দুপুরে তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানের পর নিজ এলাকায় তাঁকে দাফন করা হবে। কিন্তু মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছানোর পর গার্ড অব অনার ও দাফনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে জটিলতা
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য মানিক পশারীর মরদেহ সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের একাংশ জড়ো হন। তাঁরা মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া ও পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশি পাহারায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পরে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। তবে কখন এবং কোথায় এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে পরিবারের অভিযোগ
মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মরদেহ দাফনের বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে তাঁরা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে গেলে গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়।
ফারুক হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে রাখার পর গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর মরদেহ কোথায় দাফন করা হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিজ বাড়িতে দাফন নিয়েও বাধার অভিযোগ
পুলিশ লাইনে নেওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজনেরা নিজ বাড়িতে দাফনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু স্থানীয় সূত্রের দাবি, শংকরপাশা এলাকায় মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় কিছু জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থক আবারও জড়ো হয়ে দাফনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা যাওয়ার বিভিন্ন পয়েন্টেও লোকজনের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
দিনভর অনিশ্চয়তা ও দাফন নিয়ে জটিলতার মধ্যে পরিবারের সদস্যরা শেষ পর্যন্ত দাফনের প্রস্তুতি নেন।
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই মারা গেছেন। প্রথমে আমরা তাঁকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। কিন্তু দাফন করতে না পারায় আমরা বিপাকে পড়ি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি।’
পরিবারের সদস্যদের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মরদেহ দাফন করতে গিয়ে তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নিজ বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়।
জামায়াত নেতার বক্তব্য
এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তাঁর মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না।’
তবে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে ওঠা এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো কোনো নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
গার্ড অব অনারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে প্রশাসন
পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীমও জানিয়েছেন, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।
তবে গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়ে প্রশাসনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগকারী ছিলেন মানিক পশারী
মানিক পশারী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন মানিক পশারী। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। সেই মামলার অভিযোগকারী হিসেবে পরিচিত মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।
মৃত্যুর পরও মরদেহ দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা
একজন মৃত ব্যক্তির দাফনকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা মরদেহ দাফন করতে গিয়ে বাধা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়েন। অন্যদিকে, স্থানীয় জামায়াত নেতাদের একাংশ মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে গার্ড অব অনার ও দাফনের বিরোধিতা করেন।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নিজ বাড়িতে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর সরকারি স্বীকৃতির নথি, দাফন নিয়ে বাধার অভিযোগ এবং প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে, দাফন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা খতিয়ে দেখাও প্রয়োজন।

