পৌর শহরের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ব্যস্ততম সড়কের পাশে, কোথাও নদীর তীরে, কোথাও আবার হাটের ভেতরে কিংবা গ্রামের জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। রোদ-বৃষ্টিতে পচে এসব বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ, দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্জ্যের স্তূপে খাবার খুঁজছে কুকুর, বিড়াল ও বিভিন্ন পাখি। দুর্গন্ধ এড়াতে কেউ নাক চেপে চলাচল করছেন, কেউ দ্রুত ওই এলাকা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
নাটোর জেলার আটটি পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এমন চিত্র দেখা গেছে। পৌরসভাগুলো প্রতিষ্ঠার পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও কোথাও পূর্ণাঙ্গ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে প্রতিদিনের গৃহস্থালি ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপসারণের পরিবর্তে বিভিন্ন খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এতে শহরের বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রাম ও জনপদে।
বিশেষ করে বড়াইগ্রাম ও বনপাড়া পৌরসভার বর্জ্য বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের পাশে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের পাশে বর্জ্য জমে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি গাছপালারও ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্জ্য ফেলার কারণে খেজুর ও তালগাছসহ অন্তত ছয়টি গাছ মারা গেছে। এরপরও সেখানে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।

মহাসড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ, ক্ষতিগ্রস্ত গাছপালা
বড়াইগ্রাম ও বনপাড়া পৌরসভার বর্জ্য শহরের বাইরে নিয়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। সড়কটির পাশ দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। সেখানে বর্জ্য জমে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্জ্যের স্তূপ থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্জ্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পচন ধরে পরিবেশ আরও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। সড়কের পাশের গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
বড়াইগ্রাম পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বর্জ্য ফেলার কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের জন্য সরকারি খাসজমি খোঁজা হচ্ছে। জমি পাওয়া গেলেই ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে।
তবে জমি নির্ধারণ ও ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পৌরসভার বর্জ্য কোথায় এবং কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়েছে।
নদীর তীর ও গ্রামেও ছড়াচ্ছে পৌরসভার বর্জ্য
নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভার বর্জ্য শহরের বাইরে ধারাবাড়িষা ইউনিয়নের হরিজন পল্লী এলাকায় ফেলা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া নন্দকূজা নদীর তীরেও বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্জ্য থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে আশপাশের এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে উঠছে। এসব সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় অনেককে নাক চেপে পথ পার হতে হয়। দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে কারও কারও বমি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
আসাদ মোল্লা, হাজী মোহাম্মদ সামি ও শাহাবুদ্দিন নামের স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পৌর শহরের বর্জ্য ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রামগুলোতে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েও তাঁরা প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন।
তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

নদীর তীরে বর্জ্য ফেলা হলে বর্জ্যের ধরন ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে মাটি ও পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এসব স্থানে বর্জ্য ফেলার অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও হাটের ভেতরে
জেলার অন্য পৌরসভাগুলোতেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট রয়েছে। বাগাতিপাড়া পৌরসভার বর্জ্য পেরাবাড়িয়া সড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে মালঞ্চি বাজারের বর্জ্য জমা করা হচ্ছে হাটশেডের ভেতরে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সড়কের পাশে ও হাটের ভেতরে বর্জ্য জমে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতা এবং আশপাশের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সিংড়া পৌর শহরের চাঁদপুর এলাকায় বর্জ্য জমা করা হয়। সেখানে বর্জ্যের স্তূপ বড় হয়ে গেলে তা সরিয়ে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের জোলারবাতা এলাকায় ফেলা হয় বলে জানা গেছে। এতে মহাসড়কসংলগ্ন এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা পৌরসভাতেও বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বিভিন্ন জায়গায় ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে জেলার আটটি পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করে শহরের বাইরে ফেলে দিলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না; বরং বর্জ্য অন্য এলাকার মানুষের জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করছে।
প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পরও নেই পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা
নাটোর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌরসভাগুলোর একটি। পরে পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সিংড়া পৌরসভাও ‘ক’ শ্রেণির।
এ ছাড়া গুরুদাসপুর পৌরসভা এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া ও বড়াইগ্রাম পৌরসভাও ‘ক’ শ্রেণির মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত নলডাঙ্গা পৌরসভা ‘গ’ শ্রেণির। লালপুরের গোপালপুর পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগাতিপাড়া পৌরসভা তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদায় রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পৌর কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় প্রশ্ন উঠেছে পরিকল্পনা ও নাগরিক সেবার অগ্রাধিকার নিয়ে।
পৌরসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো শহরের বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন না থাকলে বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে, তা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এর ফলে পৌর কর্তৃপক্ষ এক স্থান থেকে বর্জ্য সরিয়ে অন্য স্থানে ফেলতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত সমস্যার কারণ হতে পারে।
গুরুদাসপুরে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ
গুরুদাসপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদা আফরোজ জানিয়েছেন, পৌরসভার নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জমি নির্ধারণের পর ডাম্পিং স্টেশনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডাম্পিং স্টেশন নির্মিত হলে পৌরসভার বর্জ্যের কারণে মানুষের যে দুর্ভোগ হচ্ছে, তা কমবে।
তবে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ, ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পর্যায়ক্রমে সব পৌরসভায় ডাম্পিং স্টেশন
স্থানীয় সরকার বিভাগের নাটোরের উপপরিচালক শামীম হোসেন বলেন, পৌরসভার সব কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ভাগাড় নেই। পৌরবাসীর জন্য এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পৌরসভার কার্যক্রম চলে এলেও মানুষের দুর্ভোগ কমাতে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এখন প্রতিটি পৌরসভার জন্য নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।
শামীম হোসেন আরও জানান, গুরুদাসপুর পৌরসভার জন্য ডাম্পিং স্টেশনের অনুমোদন হয়েছে। বড়াইগ্রামের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। কয়েকটি পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনের চাহিদা পূরণের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব পৌরসভায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু ডাম্পিং স্টেশন নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগ কমাতে প্রতিটি পৌরসভায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহের নির্দিষ্ট সময়সূচি, পরিবহনের উপযুক্ত ব্যবস্থা, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধার এবং অবশিষ্ট বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে, নদীর তীরে, হাটের ভেতরে ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। যেসব স্থানে ইতিমধ্যে বর্জ্য জমে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, সেগুলো পরিষ্কার করা এবং ভবিষ্যতে যাতে আবার বর্জ্য ফেলা না হয়, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৌর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে উঠলে একদিকে যেমন নাগরিক দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে শহরের বর্জ্য আশপাশের গ্রাম ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
দ্রুত সমাধান চান স্থানীয় বাসিন্দারা
নাটোরের আট পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্রে স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশনের অভাবে শহরের বর্জ্য অন্য এলাকার মানুষের জন্যও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করছে। মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা, নদীর তীর দূষিত হওয়ার আশঙ্কা এবং হাট-বাজারের ভেতরে বর্জ্য জমে থাকার মতো পরিস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি পৌরসভায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানানো হলেও বাস্তবে নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু জমি খোঁজা বা প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যে উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি ডাম্পিং স্টেশন চালু না হওয়া পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সড়ক, নদীর তীর, হাট ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্জ্য ফেলে মানুষের দুর্ভোগ আর না বাড়ে।

