ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

চলনবিলে ৫০ বক উদ্ধার, ৩ শিকারির জেল-জরিমানা

মোঃ ইব্রাহিম আলী, সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

চলনবিলে ৫০ বক উদ্ধার, ৩ শিকারির জেল-জরিমানা

ছবিঃ সংগৃহীত

নাটোরের সিংড়ায় চলনবিলে অভিযান চালিয়ে ৫০টি বকপাখি উদ্ধার করেছে উপজেলা প্রশাসন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের সমন্বিত একটি দল। এ সময় পাখি শিকারের অভিযোগে তিন ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে এক দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন।

অভিযানে পাখি শিকারের জন্য ব্যবহৃত ১০টি বিশেষ ‘কিল্লা ঘর’ ধ্বংস করা হয়েছে। উদ্ধার করা বকগুলো পরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়।

চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে ভোরের অভিযান

শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোরে সিংড়া উপজেলার চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের যৌথ নির্দেশনায় চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা অভিযানে অংশ নেন।

অভিযানকারীরা উপজেলার আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালান। এ সময় পাখি শিকারের জন্য স্থাপন করা বিভিন্ন ফাঁদ ও কিল্লা ঘরের সন্ধান পাওয়া যায়।

অভিযানের একপর্যায়ে ৫০টি বকপাখি উদ্ধার করা হয় এবং পাখি শিকারের অভিযোগে পূর্বভেংড়ী গ্রামের তিন ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

তিন শিকারির কারাদণ্ড ও জরিমানা

আটক ব্যক্তিদের পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। আদালত পরিচালনা করেন সিংড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পাখি শিকারের ঘটনায় আটক পূর্বভেংড়ী গ্রামের আব্দুর রশিদ (৫৫), মকছেদ আলী (৫০) ও আবু হানিফ (৪০)-কে প্রত্যেককে এক দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।

পোষা বক দিয়ে ফাঁদে ফেলা হতো অতিথি পাখি

অভিযানে অংশ নেওয়া পরিবেশকর্মীরা জানান, পাখি শিকারিরা পোষা বক ব্যবহার করে বিশেষ কৌশলে বন্য বককে আকৃষ্ট করতেন। এ জন্য বিলের মধ্যে ‘কিল্লা ঘর’ তৈরি করে সেখানে পোষা বক রাখা হতো। ওই বক দেখে আশপাশের বন্য বক সেখানে এলে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে সেগুলো আটক করা হতো।

অভিযানের সময় এমন বেশ কয়েকটি শিকারের স্থাপনা শনাক্ত করা হয়। পরে পাখি শিকারে ব্যবহৃত ১০টি কিল্লা ঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে শিকারিরা পুনরায় একই স্থানে ফাঁদ বসাতে না পারে।

উদ্ধার করা ৫০ বক অবমুক্ত

অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫০টি বকপাখি কিছু সময় নিরাপদ হেফাজতে রাখার পর প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়। পরিবেশকর্মীরা জানান, বন্যপ্রাণী ও পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থল রক্ষা করা গেলে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হবে।

চলনবিল দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি অঞ্চল হওয়ায় শুষ্ক মৌসুম ও শীতের শুরুতে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখির আনাগোনা বাড়ে। ফলে এ সময়টিতে পাখি শিকারের প্রবণতা ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।

শীতের আগমনে বাড়ে পাখির আনাগোনা

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম বলেন, শীতের আগমনকে কেন্দ্র করে বিশাল চলনবিলজুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। এই সুযোগে একটি অসাধু চক্র পাখি শিকারে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

তিনি জানান, পাখি শিকার বন্ধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাঁদের সংগঠন ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে। পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

পরিবেশকর্মীদের উপস্থিতিতে অভিযান

অভিযানে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ, যুগ্ম সম্পাদক হাসিবুল হাসান শিমুল, প্রভাষক নাহমাদুল হকসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য ও পরিবেশকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু শিকারি আটক বা পাখি উদ্ধার করলেই পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি শিকারের সরঞ্জাম ও স্থাপনা ধ্বংস, স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি।

চলনবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তাঁরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!