ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

চলনবিলের শাপলা-ঢ্যাপ বিক্রিতে সংসার চলে আব্দুল আলিমের

মো. ইব্রাহিম আলী, সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

চলনবিলের শাপলা-ঢ্যাপ বিক্রিতে সংসার চলে আব্দুল আলিমের

ছবিঃ সংগৃহীত

নাটোরের চলনবিলজুড়ে এখন হেমন্তের আবহ। বর্ষার পানি কমতে শুরু করেছে। বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির অনেক জায়গায় এখনো ফুটে আছে সাদা ও গোলাপি শাপলা। কোথাও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে ঢ্যাপ ও শালুক। প্রকৃতির দেওয়া এসব জলজ সম্পদ একদিকে মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য যোগ করছে, অন্যদিকে দরিদ্র অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহেরও অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

এমনই একজন আব্দুল আলিম (৪২)। নাটোরের সিংড়া উপজেলার জগৎপুর গ্রামের এই বাসিন্দা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি চলনবিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। বিলের বুক থেকে সংগ্রহ করা এসব জলজ সবজি নিয়ে প্রতিদিন সকালে হাজির হন সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজি বাজারে। অল্প দামে দেশি সবজি বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁর সংসারের খরচের একটি বড় অংশ।

বিল থেকে বাজার—আব্দুল আলিমের প্রতিদিনের সংগ্রাম

আব্দুল আলিমের দিন শুরু হয় ভোরের ব্যস্ততায়। আগের দিন বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক পরিষ্কার করে ছোট ছোট আঁটি বাঁধেন। এরপর সেগুলো নিয়ে চলে আসেন সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজি বাজারে। সেখানে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন নিজের সংগ্রহ করা জলজ সবজি।

তাঁর বিক্রির ধরনও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখেই। সাত থেকে দশটি ঢ্যাপের আঁটি বিক্রি করেন ১০ টাকায়। একইভাবে ১০টি শাপলার আঁটির দামও ১০ টাকা। অল্প দামের এসব সবজি কিনতে বাজারে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ রান্নার জন্য শাপলা কেনেন, কেউ ঢ্যাপ কিংবা শালুক নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

আব্দুল আলিম বলেন, ‘সারা বছর কৃষিশ্রমিকের কাজ করি। বর্ষার চার মাস বিল থেকে শাপলা, কখনো ঢ্যাপ, আবার কখনো শালুক তুলে হাটবাজারে বিক্রি করি। যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে।’

তাঁর কথায় ফুটে ওঠে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম। কৃষিশ্রমিকের কাজ সব সময় পাওয়া যায় না। আবার পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ও থেমে থাকে না। তাই যখন যে কাজের সুযোগ পান, সেটিই কাজে লাগান তিনি। চলনবিলের জলজ সবজি সংগ্রহ ও বিক্রি তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, সংসার চালিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

দিনে বাজার, বিকেলে আবার চলনবিলে

আব্দুল আলিমের কর্মব্যস্ততা শুধু সকালবেলার বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। সকালে পণ্য বিক্রি শেষ করে দুপুরের পর আবার বিলে যান। সন্ধ্যা পর্যন্ত জলাশয় ও বিলের বিভিন্ন জায়গা থেকে শাপলা, ঢ্যাপসহ পাওয়া যায় এমন জলজ সবজি সংগ্রহ করেন। এরপর বাড়িতে ফিরে সেগুলো পরিষ্কার করেন, বাছাই করেন এবং বিক্রির জন্য আঁটি বাঁধেন। পরদিন সকালে সেই আঁটি নিয়ে আবার হাজির হন বাজারে।

এভাবেই প্রতিদিনের কাজের একটি চক্র তৈরি হয়েছে তাঁর জীবনে—বিল থেকে সংগ্রহ, বাড়িতে প্রস্তুত করা, বাজারে বিক্রি এবং আবার নতুন করে সংগ্রহের প্রস্তুতি।

আব্দুল আলিম জানান, যাতায়াতের ভ্যানভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে কোনো কোনো দিন তাঁর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় থাকে। তবে প্রতিদিন সমান আয় হয় না। সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করতে পারেন। অন্য সময় কৃষিশ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তাঁর এই আয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম। বিলের মধ্যে নেমে জলজ সবজি সংগ্রহ করা, সেগুলো বাজারে নিয়ে আসা এবং ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা—প্রতিটি ধাপেই শ্রম দিতে হয়। তারপরও বাজারে ক্রেতা কম হলে কিংবা বিল থেকে পর্যাপ্ত পণ্য সংগ্রহ করতে না পারলে আয় কমে যায়।

অল্প দামে দেশি সবজি, ক্রেতাদেরও আগ্রহ

চলনবিলের শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত খাবার। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এসব জলজ সবজির রয়েছে আলাদা কদর। বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া হয় শাপলা ও শালুক। ঢ্যাপও অনেকের কাছে পরিচিত ও পছন্দের খাবার।

সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাজারে এসব পণ্য কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘ছোটবেলায় বিলে শাপলা তুলেছি, শালুক তুলেছি। এখন সেসব স্মৃতি। বিলের সেই শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক অল্প টাকায় কিনতে পারছি। ভালোই লাগছে।’

তাঁর কথায় উঠে আসে চলনবিলকে ঘিরে মানুষের শৈশবের স্মৃতি ও গ্রামীণ জীবনের পরিচিত ছবি। একসময় যেসব জলজ উদ্ভিদ গ্রামাঞ্চলের শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, সেগুলো এখনো স্থানীয় বাজারে মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করছে।

একই বাজারে শাপলা ও ঢ্যাপ কিনতে এসেছিলেন কলেজশিক্ষার্থী আরমান। তিনি বলেন, ‘শাপলার সবজি রান্না করে খেতে আমার বাবা-মা খুব পছন্দ করেন। তাই তিন আঁটি শাপলা আর দুই আঁটি ঢ্যাপ কিনেছি।’

ক্রেতাদের এমন আগ্রহের কারণে স্থানীয় বাজারে এসব জলজ সবজির একটি নির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে। আর সেই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে আব্দুল আলিমের মতো মানুষ জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন।

চলনবিলের প্রাকৃতিক সম্পদ, গ্রামীণ অর্থনীতির অবলম্বন

চলনবিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি অঞ্চল। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়। এ সময় জলজ উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য দেখা যায়। পানি কমতে শুরু করলে বিলের বিভিন্ন অংশে পাওয়া যায় শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুকের মতো জলজ খাদ্য উপকরণ।

এসব সম্পদ স্থানীয় মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি মৌসুমি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে কৃষিকাজের বাইরে যাঁদের স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই, তাঁদের অনেকেই মৌসুমভেদে বিলের সম্পদ সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয় করেন।

আব্দুল আলিমের জীবনও তার একটি উদাহরণ। তিনি একদিকে কৃষিশ্রমিক, অন্যদিকে চলনবিলের জলজ সবজি বিক্রেতা। কাজের সুযোগ ও মৌসুমি প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে তাঁকে জীবিকার ধরন বদলাতে হয়। এতে তাঁর আয় একদিকে যেমন অনিশ্চিত, অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

তবে জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, পানি ও পরিবেশের মান বজায় রাখা এবং জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিস্তার ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা অনেকাংশে বিলের পরিবেশ ও মৌসুমি পানিপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।

পরিশ্রমের আয়ে চলে সংসার

আব্দুল আলিমের গল্প শুধু একজন জলজ সবজি বিক্রেতার গল্প নয়; এটি চলনবিলের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম ও প্রকৃতিনির্ভর জীবিকারও প্রতিচ্ছবি। দিনভর পরিশ্রম করে অল্প অল্প আয় জমিয়েই তাঁকে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে হয়। কখনো কৃষিশ্রমিকের কাজ, কখনো বিল থেকে শাপলা-ঢ্যাপ সংগ্রহ—এভাবেই চলে তাঁর জীবন।

বাজারে ১০ টাকার আঁটি বিক্রি করতে করতে হয়তো খুব বেশি আয় হয় না, কিন্তু এই সামান্য উপার্জনই তাঁর পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চলনবিলের জলজ সম্পদ তাঁর কাছে তাই কেবল বিক্রির পণ্য নয়, বরং জীবনের কঠিন সময়ে টিকে থাকার অবলম্বন।

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, প্রতিদিনের পরিশ্রমকে সঙ্গী করে আব্দুল আলিমের মতো মানুষ জীবিকার পথ তৈরি করে চলেছেন। তাঁদের শ্রমে একদিকে সচল থাকছে স্থানীয় বাজার, অন্যদিকে বেঁচে থাকছে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুকের গ্রামীণ বাজারসংস্কৃতি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!