সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয়েছিল পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়। ভাষা, সংস্কৃতি আর হাজার হাজার কিলোমিটারের ভৌগোলিক দূরত্বও থামাতে পারেনি তাদের সম্পর্ককে। অবশেষে প্রেমের টানে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন ৩০ বছর বয়সী চীনা যুবক ওয়্যাং সুলিন। ইসলাম গ্রহণের পর তার নতুন নাম রাখা হয়েছে মো. নুর উদ্দিন।
এই ব্যতিক্রমী ভালোবাসার গল্প এখন শুধু মোহনগঞ্জেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি যেন এক আন্তর্জাতিক প্রেমকাহিনির বাস্তব রূপ।
ফেসবুকে পরিচয়, অল্প সময়েই গভীর সম্পর্ক
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমিন আক্তার লিজা (২০)-এর সঙ্গে প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় চীনের লুবেই প্রদেশের লুরাং শহরের বাসিন্দা ওয়্যাং সুলিনের। নিয়মিত কথোপকথনের একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেমের সম্পর্ক।
সম্পর্কের বিষয়টি তারা নিজ নিজ পরিবারকে জানালে উভয় পরিবারই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। এরপর দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রেমিকার টানে চীন থেকে বাংলাদেশ
ভালোবাসার টানে গত ১৮ জুলাই চীন থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান ওয়্যাং সুলিন। পরে লিজার পরিবারের সদস্যরা তাকে রাজধানী থেকে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে নিয়ে যান।
সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর ২১ জুলাই স্থানীয় আইনজীবীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদের বিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
ধর্মান্তরের পর চীনা যুবকের নতুন নাম রাখা হয় মো. নুর উদ্দিন।
জমকালো আয়োজনের প্রস্তুতি
আইনগতভাবে বিয়ে সম্পন্ন হলেও সামাজিকভাবে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাতে আগামী ৩১ জুলাই মোহনগঞ্জে আয়োজন করা হয়েছে জমকালো বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানের।
এ উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্যান্ডেল নির্মাণ, অতিথিদের দাওয়াতপত্র বিতরণ এবং অন্যান্য প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে কনেপক্ষ।
প্রতারণার আশঙ্কায় ছিল পরিবারের সতর্কতা
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে পরিচয় ও বিয়েকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতারণার ঘটনা সামনে আসায় প্রথমদিকে কিছুটা সতর্ক ছিল লিজার পরিবার।
লিজার বাবা ও আসবাবপত্র ব্যবসায়ী মো. নাজিম উদ্দিন জানান, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা চীনে থাকা সুলিনের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের মাধ্যমেও তার পরিচয়, পেশা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করেন।
সব তথ্য সঠিক পাওয়ার পরই তারা বিয়ের সিদ্ধান্তে সম্মতি দেন। তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তীতে নুর উদ্দিন লিজাকে চীনে নিয়ে যাবেন।
দুই সংস্কৃতির মিলনে নতুন অধ্যায়
স্থানীয়দের মতে, এই বিয়ে শুধু দুই তরুণ-তরুণীর নয়, বরং দুই দেশের দুই ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও এক সুন্দর বন্ধন।
মোহনগঞ্জের বাসিন্দারা বলছেন, বিদেশি জামাইকে একনজর দেখতে প্রতিদিনই উৎসুক মানুষ লিজাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, আবার কেউ এই ব্যতিক্রমী প্রেমের গল্প শুনতে চাইছেন।
এলাকাজুড়ে উৎসবের আবহ
চীনা যুবকের সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণীর বিয়েকে ঘিরে পুরো মোহনগঞ্জ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ। স্থানীয়দের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক এই প্রেমের গল্প তাদের জন্য যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আনন্দেরও।
পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নবদম্পতির নতুন জীবন সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে। একই সঙ্গে এই সম্পর্ক বাংলাদেশ ও চীনের মানুষের পারস্পরিক বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

