হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত চারটি অত্যাবশ্যক চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, এ লক্ষ্যে খুব শিগগিরই একটি স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) জারি করা হতে পারে।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে হার্টের স্টেন্ট (রিং), পেসমেকার, হার্ট ভালভ এবং অক্সিজেনেটরের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন হৃদরোগে আক্রান্ত সাধারণ রোগীরা, যাদের অনেকেই উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না।
যেসব চিকিৎসা সরঞ্জামে ভ্যাট উঠছে
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, যেসব চিকিৎসা সরঞ্জামে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—
ভাসকুলার স্টেন্ট (হার্টের রিং)
পেসমেকার
হার্ট ভালভ
অক্সিজেনেটর
বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ এবং সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর রয়েছে। নতুন এসআরও কার্যকর হলে উভয় পর্যায়ের ভ্যাটই প্রত্যাহার করা হবে।
চিকিৎসা ব্যয় কমবে আরও
এর আগে চলতি অর্থবছরের বাজেটে হার্টের স্টেন্টের সরবরাহ পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এতে প্রতিটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
নতুন এসআরও কার্যকর হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় করের চাপ কমে যাবে। ফলে আমদানিকারক, হাসপাতাল এবং শেষ পর্যন্ত রোগী—সব পর্যায়েই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রায় চূড়ান্ত এসআরও
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ভ্যাট অব্যাহতির এসআরওর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন শেষ হলেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
"বর্তমানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা যেন আরও সহজলভ্য হয়, সে লক্ষ্যেই সরকার এই কর-ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে।"
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশে হৃদরোগ এখন অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর বড় একটি অংশই হৃদরোগের কারণে ঘটে।
কিন্তু হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অধিকাংশ আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামই শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় রোগীদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর কমলে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই কমবে না, বরং অনেক রোগী সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারবেন।
দেশে স্টেন্টের বাজার কত বড়?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী—
দেশে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়।
শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটেই বছরে ৯ হাজারের বেশি স্টেন্ট ব্যবহার হয়।
বছরে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০টি হার্ট ভালভ প্রয়োজন হয়।
১,৮০০ থেকে ২,০০০টি পেসমেকার প্রতিস্থাপন করা হয়।
দেশে স্টেন্টের বাজারের আকার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে কত দামে বিক্রি হয়?
বর্তমানে ব্র্যান্ড ও প্রযুক্তিভেদে—
হার্টের স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত।
পেসমেকারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
কর কমলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের রোগীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞদের মত
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের বড় একটি অংশই যায় স্টেন্ট, পেসমেকার ও অন্যান্য ইমপ্লান্ট কেনার পেছনে। সরকার যদি এসব জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের ওপর করের বোঝা কমায়, তাহলে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং অনেক পরিবারের আর্থিক চাপও কমবে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং ব্যয় আরও হ্রাস পাবে।
প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ
সরকারের এই উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্যবান্ধব একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। দেশে হৃদরোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে, অথচ আধুনিক চিকিৎসার ব্যয় এখনও অনেক মানুষের নাগালের বাইরে। জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার শুধু রোগীদের আর্থিক স্বস্তিই দেবে না, বরং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করে মৃত্যুঝুঁকিও কমাতে সহায়ক হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর কমানোর পাশাপাশি বাজারে মূল্য তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে কর-সুবিধার পুরো সুফল আমদানিকারক বা হাসপাতালের পরিবর্তে সরাসরি রোগীরা পান।

