ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

menu

৬৫৯ কোটি টাকার বিক্রি, রিটার্নে ৩৯ কোটি—জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলা

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

৬৫৯ কোটি টাকার বিক্রি, রিটার্নে ৩৯ কোটি—জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলা

ছবিঃ সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং নামের একটি সুতা আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪০ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ৯৪২ টাকার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৬৫৯ কোটি টাকার বেশি সুতা বিক্রি করলেও ভ্যাট রিটার্নে প্রকৃত বিক্রির তথ্যের সঙ্গে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। একই সময়ে সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমা দেওয়ার পরিমাণও ছিল অত্যন্ত কম।

এ ঘটনায় ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে নারায়ণগঞ্জ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের অর্থ আদায় এবং প্রযোজ্য সুদ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ দপ্তর মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

আকস্মিক পরিদর্শনে অনিয়মের তথ্য

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদরের টানবাজার এলাকার এস এম মালেহ রোডে অবস্থিত জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং সুতা আমদানি ও সরবরাহের ব্যবসা পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের নিবারক দল মজুত পণ্য এবং হিসাব ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে।

পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দলিলাদি দেখাতে ব্যর্থ হয় বলে জানিয়েছে কমিশনারেট। পরে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন রেজিস্টার, হিসাবের খাতা, চালান বই, গার্ড ফাইল, কম্পিউটারে সংরক্ষিত তথ্যের এক্সেল কপি এবং প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধির স্বাক্ষরযুক্ত একটি বিবৃতি জব্দ করা হয়।

জব্দ করা এসব নথি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বিক্রির তথ্য এবং দাখিল করা ভ্যাট রিটার্নের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি শনাক্ত করা হয়। কমিশনারেটের দাবি, নথিপত্রে পাওয়া বিক্রির পরিমাণের সঙ্গে সরকারি হিসাবের জন্য দাখিল করা তথ্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

৬৫৯ কোটি টাকার বেশি সুতা বিক্রি

কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের সুতা বিক্রির বিবরণীতে মোট ৬৫৯ কোটি ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৫৯১ টাকার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

এই বিক্রির ওপর ৫ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাটের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ কোটি ৪০ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪২ টাকা। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা ভ্যাট রিটার্নে বিক্রির যে হিসাব দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বিক্রির বিবরণীতে পাওয়া তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দাখিল করা ভ্যাট রিটার্নে (মূসক-৯.১) প্রতিষ্ঠানটি মোট বিক্রি দেখিয়েছে ৩৯ কোটি ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২৩০ টাকা। অথচ একই সময়ের বিক্রির বিবরণীতে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এই ব্যবধানের কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির প্রকৃত হিসাব এবং ভ্যাট পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে কমিশনারেট ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে মামলা করেছে।

সরকারি কোষাগারে জমা মাত্র ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা

কমিশনারেটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে মাত্র ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট জমা দিয়েছে।

অন্যদিকে, বিক্রির বিবরণীর ভিত্তিতে নির্ধারিত প্রযোজ্য ভ্যাটের পরিমাণ ৪০ কোটি ৪০ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪২ টাকা। জমা দেওয়া অর্থ বাদ দেওয়ার পর সরকারের পাওনা হিসেবে ৪০ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ৯৪২ টাকা নির্ধারণ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই অর্থ সরকারের রাজস্ব হিসেবে আদায়যোগ্য। ভ্যাটের পাশাপাশি প্রযোজ্য সুদ আদায়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ভ্যাট চালান ইস্যু না করার অভিযোগ

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং সুতা বিক্রির সময় ভ্যাট চালান ইস্যু করেনি। এ ছাড়া বিক্রির প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে ভ্যাট রিটার্নে উল্লেখ করা তথ্যের বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়িক লেনদেনের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ, প্রযোজ্য ভ্যাট নির্ধারণ এবং নির্ধারিত নিয়মে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে বিক্রির তথ্য ও দাখিল করা রিটার্নের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে প্রকৃত করদায় নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জব্দ করা নথিপত্র ও হিসাবের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য থেকে ধারণা করা যায়। তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং মামলার পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

রাজস্ব ফাঁকি রোধে নজরদারির গুরুত্ব

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন করা, ভ্যাট রিটার্নে অসংগতিপূর্ণ হিসাব দেখানো কিংবা প্রযোজ্য কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার ঘটনা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র, বিক্রির রেকর্ড, ভ্যাট চালান এবং দাখিল করা রিটার্নের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি। নারায়ণগঞ্জের জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলা রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত ও আদায়ের প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

এখন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পরবর্তী কার্যক্রম, নির্ধারিত ভ্যাট ও সুদ আদায় এবং অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!