দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ও দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলাকে ঘিরে নতুন করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বন্দরটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন এবং সড়ক, রেল ও আকাশপথের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তাঁর প্রথম খুলনা সফর। এ সফরে তিনি মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি ও প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় নাব্যতা নিশ্চিত করাসহ সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
এর আগে গত ১০ অক্টোবর মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত উন্নয়ন উদ্যোগ, বিদেশি অর্থায়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে বন্দরটি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মোংলা বন্দর শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, বাড়বে বন্দরের সক্ষমতা
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির অন্যতম লক্ষ্য বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিচালনব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করা। বন্দর পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পণ্য ওঠানো-নামানো, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যে বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে পণ্য খালাসের সময়, জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং বন্দরসংক্রান্ত সেবার দক্ষতার ওপর। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের সময় ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য রপ্তানিপণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দরে আধুনিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য খালাসের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে ঋণচুক্তির আওতায় কোন কোন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কত এবং নতুন সক্ষমতা কতটা বাড়বে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রকল্পতথ্য প্রকাশ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চ্যানেলে ড্রেজিং, বড় জাহাজ ভেড়ানোর প্রত্যাশা
মোংলা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা নিশ্চিত করা। চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানির গভীরতা ও নৌযান চলাচলের উপযোগিতা বাড়ানো গেলে তুলনামূলক বেশি ড্রাফটের পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে জাহাজের ড্রাফট, জোয়ার-ভাটা ও চ্যানেলের নাব্যতার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বন্দরে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা করতে হয়। নাব্যতা উন্নত হলে জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনাও আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হতে পারে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় নাব্যতা অর্জনসহ সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পরে তিনি প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন।
সালাহ্ উদ্দিন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দর চ্যানেলে ড্রেজিং করা হলে নাব্যতা বাড়বে। এর ফলে অধিক ড্রাফটের জাহাজ এ বন্দরে ভেড়ানো সম্ভব হবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশা করছে।
নিয়মিত ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি খনন করা নাব্যতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। পলি জমার প্রবণতা, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলে বন্দর উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা ও নৌবাণিজ্যের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হওয়ার সম্ভাবনা কতটা
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে কোনো বন্দরে জাহাজের সরাসরি আগমন, পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা এবং অন্যান্য বন্দরের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোংলা বন্দরের নাব্যতা, জেটি, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হলে বিদেশি জাহাজের কাছে বন্দরটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে পরিচিতি অর্জনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের অবস্থান তৈরি করতে শুধু বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক শিপিং রুট, জাহাজ পরিচালন ব্যয়, পণ্য পরিবহনের চাহিদা, কাস্টমসের কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট সেবার মানও গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি অংশ মোংলা বন্দরে স্থানান্তর করা সম্ভব হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে কাজের চাপ বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ বাড়বে এবং কোনো একটি বন্দরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে অন্য বন্দর ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগানো যাবে।
তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা ও সেবার মান আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সময় কমানো এবং আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন।
সড়ক, রেল ও আকাশপথের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগের পরিকল্পনা
বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু জেটি ও নৌচ্যানেলের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। বন্দর থেকে দেশের শিল্পাঞ্চল, স্থলবন্দর, গুদাম ও বাজারে দ্রুত পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে খুলনা-মোংলা সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, খুলনা-ভাঙ্গা সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া এবং পণ্য পরিবহনে ওয়াগন ও কনটেইনার ট্রেন চালুর বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে সময় কমানো এবং ভারী যানবাহনের চলাচল আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো গেলে দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বড় পরিমাণ পণ্য তুলনামূলক সুশৃঙ্খলভাবে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সুবিধা কাজে লাগাতে বন্দর, রেলওয়ে, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিকস সেবাদাতাদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পণ্য ওঠানো-নামানো, কনটেইনার সংরক্ষণ, রেলওয়াগন সরবরাহ ও গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়সূচি সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা গেলে বন্দরের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, বিদেশি জাহাজের প্রতিনিধি ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ করতে খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত এবং সম্ভাব্য শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে আকাশপথের সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিমানবন্দর চালুর প্রকৃত অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কার্যক্রম শুরুর সময়সীমা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে শিল্পায়নের আশা
মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আরেকটি বড় দিক হলো প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল। বন্দরের কাছাকাছি পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে আমদানি করা কাঁচামাল সরাসরি কারখানায় নেওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বন্দরে পৌঁছে রপ্তানি করার সুযোগ বাড়তে পারে।
এ ধরনের সমন্বিত অবকাঠামো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে গুদাম, কনটেইনার ডিপো, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও অন্যান্য সহায়ক সেবা খাতেও নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন বাড়লে খুলনা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও এর সুফল পেতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনশক্তি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শিল্পাঞ্চল ঘোষণা করলেই বিনিয়োগ আসবে না; বাস্তব সুযোগ-সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা: দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হোক
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মোংলা বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বন্দরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি আশা করেন।
জুলফিকর আলীর মতে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধিতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগের সম্ভাবনা
বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বন্দর পরিচালনা, জাহাজের মালামাল ওঠানো-নামানো, কনটেইনার পরিবহন, গুদাম ব্যবস্থাপনা, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পকারখানায় সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে জীবিকা হারানো বা জীবিকার ধরন পরিবর্তনে বাধ্য হওয়া মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্প সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, যদি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় বন্দর সম্প্রসারণ ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। সুন্দরবন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলোর একটি। এ অঞ্চলে শিল্পায়ন ও নৌপরিবহন বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় বন, নদী, জলজ প্রাণী এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।
ড্রেজিং, জাহাজ চলাচল, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে পরিবেশ সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়গুলো পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
বাস্তবায়নই হবে সম্ভাবনা কাজে লাগানোর মূল চ্যালেঞ্জ
মোংলা বন্দরের সামনে এখন বড় সুযোগের পাশাপাশি বেশ কিছু বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ঋণচুক্তির আওতায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ধরে রাখা, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়ন, কাস্টমসের আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণ—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বন্দর অবকাঠামো উন্নত হলেও পণ্য পরিবহনের জন্য কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ না থাকলে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে। একইভাবে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলেও জাহাজের জন্য পর্যাপ্ত নাব্যতা, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং দক্ষ কনটেইনার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে বন্দরটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সীমিত থেকে যেতে পারে।
তাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, অর্থায়নের ব্যবহার, কাজের সময়সীমা এবং প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন, বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মোংলা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি, বন্দর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা, নাব্যতা উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে মোংলা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ।

