নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বাড়তি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে গতকাল পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। বুধবার (২৮ অক্টোবর) নির্ধারিত নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা তোলা সম্ভব হলে অক্টোবর মাসে সরকারের মোট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
সরকারের ধারাবাহিক ঋণ গ্রহণের এ প্রবণতা রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ চাহিদা বাড়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এক মাসে ঋণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে।
অক্টোবর মাসেও ঋণ গ্রহণের গতি অব্যাহত রয়েছে। মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। বুধবারের নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা তোলা হলে এক মাসে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামে সংগৃহীত অর্থের পুরোটাই সরকারের নতুন বা নিট ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। এর একটি বড় অংশ আগের নেওয়া ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ করতে হয়। ফলে সরকারের প্রকৃত ঋণ পরিস্থিতি বুঝতে মোট ঋণের পাশাপাশি নিট ঋণের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
কেন ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল?
সাধারণত সরকার ব্যাংক খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে। এসব স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের মাধ্যমে সরকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে এবং মেয়াদ শেষে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী তা পরিশোধ করে।
তবে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ব্যবধান তৈরি হলে নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। এ ধরনের বিলের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামের আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ সরকারের তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করলেও ঘন ঘন এ ধরনের ঋণের প্রয়োজন হলে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বাড়ছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার
সরকারের ঋণ গ্রহণের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে।
ইল্ড হলো সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত বার্ষিক মুনাফার হার। সরকারি ঋণপত্রের চাহিদা ও সরবরাহ, সুদের হার এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর এর পরিবর্তন নির্ভর করে।
সরকারের ঋণ চাহিদা বাড়লে ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য তুলনামূলক বেশি ইল্ড দিতে হতে পারে। এতে সরকারের ঋণের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ডও বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকলেও ঋণের চাপ কেন?
ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ গত আগস্ট শেষে রেকর্ড ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ থাকলেও সরকারের ঋণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ইল্ড বাড়ছে।
ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা এবং সরকার কম সুদে ঋণ নিতে পারা—দুটি বিষয় সব সময় একভাবে কাজ করে না। ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন কৌশল, তারল্যের বণ্টন, ঋণপত্রের মেয়াদ, বাজারে সুদের প্রত্যাশা এবং সরকারের অর্থ সংগ্রহের চাহিদা ইল্ড নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
তবে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের একটি বড় অংশ সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ হতে পারে। পরিস্থিতিভেদে এতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের সুযোগ ও সুদের হারের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাড়ছে ব্যাংকনির্ভরতা
সরকারের ব্যাংকঋণের চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতিকে উল্লেখ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে সরকারি ব্যয় নির্বাহে বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া সরকারের অন্যতম উপায়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বেড়েছে। এই ব্যবধান সামাল দিতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য অর্থের সংস্থান করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যয় ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়তে পারে সরকারের ব্যয়
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেতন-ভাতা ও বকেয়া পরিশোধের জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকলে এ ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রয়োজন আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে নতুন বেতনহার, কার্যকরের সময়, বকেয়া পরিশোধের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সুকুক থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা
ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সুকুক হলো শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ সনদ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত কাঠামোয় অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো সম্ভব হলে সরকারের অর্থ সংগ্রহের উৎস সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে প্রচলিত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সরকারের অর্থায়ন পরিস্থিতির টেকসই উন্নতির জন্য শুধু ঋণের উৎস বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সমন্বয় প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নতুন বেতনকাঠামোর ব্যয় মেটানো, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং নিয়মিত সরকারি ব্যয় নির্বাহের কারণে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ চাহিদা বাড়ছে। অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর লক্ষ্য সেই চাপেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে রাজস্ব আদায়ের গতি, সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ এবং ঋণের সুদহারের পরিবর্তন সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

