ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

এলএনজি আমদানিতে ৪১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের শঙ্কা, ভর্তুকির চাপ বাজেটের কয়েকগুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম

এলএনজি আমদানিতে ৪১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের শঙ্কা, ভর্তুকির চাপ বাজেটের কয়েকগুণ

ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় তুলনামূলক বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনও কয়েকগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) নথিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নির্দিষ্টসংখ্যক এলএনজি কার্গোর মূল্যবৃদ্ধি ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। তবে এটি বিভিন্ন কার্গোর সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও বিনিময় হার ধরে করা একটি প্রাক্কলন; অর্থবছর শেষে সরকারের প্রকৃত ভর্তুকি ব্যয় একই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি আমদানির ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ পেট্রোবাংলার অর্থ পরিদপ্তরের পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে। অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের হিসাবেই বরাদ্দের তুলনায় ভর্তুকির প্রয়োজন চার গুণের বেশি।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম উচ্চপর্যায়ে থাকলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এতে বাজেট ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা—সবকিছুই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহ বিঘ্ন, স্পট মার্কেটে বাড়ছে নির্ভরতা

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসে। এসব চুক্তিতে নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী দাম হিসাব করা হয়, ফলে স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকতে পারে। বিপরীতে, স্পট মার্কেটে তাৎক্ষণিক সরবরাহ ও চাহিদা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাহাজ চলাচলের ওপর নির্ভর করে দাম দ্রুত ওঠানামা করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এলএনজি বাজারেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কাতার এনার্জিসহ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রত্যাশিত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এর ফলে তুলনামূলক কম দামে চুক্তিভিত্তিক গ্যাস পাওয়ার সুযোগ সীমিত হলে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কিনতে হচ্ছে। আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ৯ থেকে ১১ ডলারে পাওয়া যেত বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাজার পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেটে দাম ২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। কোনো কোনো কার্গোর ক্ষেত্রে দাম ২৮ থেকে ৩০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমএমবিটিইউ হলো গ্যাসের তাপীয় শক্তির পরিমাণ পরিমাপের একটি একক। এলএনজির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই একক ব্যবহার করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম কয়েক ডলার বাড়লেও বিপুল পরিমাণ গ্যাস আমদানির কারণে মোট ব্যয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

যেভাবে ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের হিসাব

পেট্রোবাংলার নথিতে ২০২৬ সালের এলএনজি আমদানির সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে দুটি পৃথক হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। এর একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ না পাওয়া কার্গোর বিকল্প ব্যবস্থা এবং অন্যটি স্পট মার্কেট থেকে কেনা কার্গোর মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

নথি অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এক বছরে ৮৬টি কার্গো আসার কথা ছিল। অক্টোবর পর্যন্ত এসেছে ২৬টি। নভেম্বরে আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে এবং ডিসেম্বরে আরেকটি কার্গো আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সরবরাহের তুলনায় ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এই হিসাবের ক্ষেত্রে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির গড় দাম ২৩ ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গড় দাম ৯ দশমিক ৭৫ ডলার ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি এমএমবিটিইউতে দুই ধরনের ক্রয়মূল্যের ব্যবধান ১৩ দশমিক ২৫ ডলার। এই ব্যবধানের ভিত্তিতে ৫৮টি কার্গোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় হিসাবে স্পট মার্কেট থেকে আগে কেনা কার্গোর তুলনায় নতুন করে কেনা ২৯টি কার্গোর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১৫ ডলার থেকে বেড়ে ২৩ ডলার হওয়ায় ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৮ ডলার। এই হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৯ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।

দুটি হিসাব যোগ করলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এ হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২৩ টাকা ধরা হয়েছে।

তবে এই অঙ্ককে সরকারের চূড়ান্ত ভর্তুকি ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কারণ, প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি কার্গো আমদানি করা হচ্ছে, প্রতিটি কার্গোর ক্রয়মূল্য কত, সরবরাহ পরিস্থিতি কী রকম থাকছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার কত থাকে—এসব বিষয়ের ওপর। এ ছাড়া আমদানি করা গ্যাস বিক্রি থেকে পাওয়া আয় ও সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যও ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ, ভর্তুকির প্রয়োজন ২৫ হাজার কোটি

এলএনজি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরকারের ভর্তুকির হিসাবেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু পেট্রোবাংলার অর্থ পরিদপ্তরের পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে।

অর্থাৎ, নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় ভর্তুকির প্রয়োজন প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সঙ্গে পাঁচ মাসের এই হিসাব দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সরকারকে কত বড় আর্থিক দায় নিতে হতে পারে।

পেট্রোবাংলার অর্থ পরিদপ্তরের পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বছর এখনো শেষ হয়নি, তাই এখন ভর্তুকির হিসাব করা সম্ভব নয়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে আমরা যে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি তাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগছে। কারণ ডিসেম্বরের কার্গো এখনো কেনা বাকি। কেমন দামে কিনতে হবে সেটিও নিশ্চিত নয়।’

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের কার্গোর ক্রয়মূল্য এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো অর্থবছরের ব্যয় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে; বিপরীতে দাম বাড়লে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।

দুই বছরে বেড়েছে এলএনজি ভর্তুকির ব্যয়

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দুই অর্থবছরের ব্যবধানে ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশীয় বাজারে গ্যাস বিক্রির মূল্য ও প্রকৃত আমদানি ব্যয়ের ব্যবধান এই চাপের অন্যতম কারণ। আমদানি করা গ্যাসের ক্রয়মূল্য বেড়ে গেলেও দেশীয় গ্রাহকদের কাছে বিক্রির দাম একই হারে বাড়ানো না হলে সেই ব্যবধান পূরণে সরকারের ভর্তুকি দিতে হয়।

এতে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হলেও সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ভর্তুকির জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হলে বাজেটের অন্যান্য খাতের ব্যয় পরিকল্পনাও প্রভাবিত হতে পারে। তবে এলএনজি ভর্তুকির অতিরিক্ত অর্থ কোন খাত থেকে কীভাবে জোগান দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখানে উল্লেখ নেই।

গ্যাসের চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে সংকট

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও আমদানি হঠাৎ কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে, বেশি দামে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখলে সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও আর্থিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি মূল্য দিতে হয়। তাই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম মনে করেন, এলএনজি আমদানিতে ব্যয়বৃদ্ধির চাপ থেকে বের হতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি থেকে একদিনে বের হওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের দেশি গ্যাসের অনুসন্ধান এবং উত্তোলন বাড়াতে হবে। ভূতাত্ত্বিকভাবে মনে করি আমাদের দেশে গ্যাস সম্পদের প্রাচুর্য আছে। এই সম্পদকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।’

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন কূপ খনন, সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে আনতে সময়, বিনিয়োগ এবং কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার আহ্বান

ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘পাশাপাশি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এখানকার সূর্যের তাপ-আবহাওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য উপযোগী। ইউরোপের অনেক দেশে আমাদের মতো সানশাইন নেই। তারা অনেক বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করছে। আমাদের এদিকে এগোতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা থেকে বের হয়ে আসতে পারবো।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনা আমদানি ব্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, জমি ও অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে একাধিক উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশের জন্য এলএনজি আমদানির বর্তমান পরিস্থিতি একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে। আবার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয় কার্গো সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্রয়মূল্য, সরবরাহের সময়সূচি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি সতর্কভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে, এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আর্থিক ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। তবে এই অঙ্ক একটি প্রাক্কলন; চূড়ান্ত ব্যয় নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহ পরিস্থিতি, কার্গোর সংখ্যা ও বিনিময় হারের ওপর। সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কার্যকর পথ তৈরি করা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!