চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। এর ফলে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহজনিত ভোগান্তিও অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বর্তমান সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, তা স্বীকার করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মানুষের কষ্টের বিষয়ে সরকার সমব্যথী। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চলতি মাসের মধ্যেই সার্বিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাহিদার ৮৮ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ
ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, চাহিদার তুলনায় বর্তমানে প্রায় ৮৮ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ বজায় রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
এই ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য খাতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত সংকটের প্রভাব অনুভব করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে এলএনজি সরবরাহে চাপ
বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কথা তুলে ধরেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি জানান, বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে সাধারণ সময়ে প্রায় ১০০ থেকে ১০৫টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায় সেই সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে এখন স্পট মার্কেট বা খোলা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার সম্ভাব্য সব বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কাতার থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা
কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাতার থেকেও এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে স্বস্তির আশা
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
এর ফলে কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া, নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন না হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ভোগান্তি দেখা দেয়।
তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী।
বাড়ানো হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তার সক্ষমতা
দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নতুন অবকাঠামো তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন ইউনিটটি চালু হলে দেশে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশের মোট ক্রুড অয়েল পরিশোধন সক্ষমতা ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলায় কিছুটা সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতেও এ ধরনের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব
জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়ি নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করলে সরকার তা উপযুক্ত মূল্যে কিনে নেবে বলেও জানান তিনি।
সংকট কাটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বিশেষ করে এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ, তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ—এসব উদ্যোগকে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে দেখছে সরকার।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সংকট পুরোপুরি কাটাতে কতটা সময় লাগবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সরকারের প্রত্যাশা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি শুরু হবে এবং চলতি মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে।

