ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বিদ্যুৎ সংকটে মেডিক্যালে রোগীর ভরসা হাতপাখা, জ্বালানি না থাকায় বন্ধ জেনারেটর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

বিদ্যুৎ সংকটে মেডিক্যালে রোগীর ভরসা হাতপাখা, জ্বালানি না থাকায় বন্ধ জেনারেটর

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব এবার পড়েছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাতেও। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একটি ভবনে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা। প্রচণ্ড গরমে ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে অসুস্থ রোগীদের স্বস্তি দিতে এখন ভরসা হয়ে উঠেছে চার্জার ফ্যান ও হাতপাখা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মেডিসিন বিভাগের একটি অংশ ক্যাম্পাসের এক পাশে অবস্থিত পাঁচতলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। ভবনটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এসব রোগীর সঙ্গে থাকেন পাঁচ শতাধিক স্বজন। বিদ্যুৎ চলে গেলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ওয়ার্ডের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।

দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং

ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ফজরের নামাজের পর থেকে পরদিন একই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকায় দিনে মোট তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডের সিলিং ফ্যান বন্ধ হয়ে যায়। অতিরিক্ত রোগী ও স্বজনের কারণে এমনিতেই ওয়ার্ডে গরম থাকে। এর সঙ্গে ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে অসুস্থ রোগীদের শারীরিক অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়।

মেডিসিন বিভাগে মেয়েকে নিয়ে সাত দিন ধরে হাসপাতালে থাকা আব্দুল কাইয়ুম জানান, তার মেয়ে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। আরও কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। কিন্তু প্রতিদিনের লোডশেডিংয়ে রোগী ও স্বজনদের ব্যাপক কষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত রোগী ও স্বজন থাকায় ওয়ার্ডে এমনিতেই গরম। আলো-বাতাসও পর্যাপ্তভাবে প্রবেশ করে না। ফ্যান চললেও স্বস্তি পাওয়া যায় না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। মেয়ের কষ্ট কমাতে তিনি একটি চার্জার ফ্যান ও দুটি হাতপাখা কিনেছেন।

বিদ্যুৎ না থাকলেই থেমে যায় স্বস্তি

মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি অন্যান্য রোগী ও স্বজনদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে সিলিং ফ্যানের পাশাপাশি কেউ কেউ ব্যক্তিগত চার্জার ফ্যান ব্যবহার করে কিছুটা স্বস্তি পান। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে এসব ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

স্বজনরা জানান, তারা একাধিকবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জেনারেটর চালু করে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ করেছেন। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীরাও প্রচণ্ড গরম ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে অস্বস্তিতে পড়ছেন। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে বাতাস করার ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে স্বজনদের।

লিফট বন্ধ, পাঁচতলায় ওঠানামায় দুর্ভোগ

পাঁচতলা ভবনে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আরেকটি বড় সমস্যা হলো লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট ব্যবহার করা যায় না। ফলে ওষুধ, খাবার বা অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে স্বজনদের সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়।

পাঁচতলায় ভর্তি স্বামীর সঙ্গে থাকা রহিমা বেগম বলেন, রোগীকে সুস্থ করতে হাসপাতালে এসে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো অবস্থায় আছেন। তিনি জানান, দিনমজুরি করে সংসার চালান এবং চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা তার পরিবারের জন্য কঠিন। স্বামীর কষ্ট কমাতে তিনিও দুটি হাতপাখা কিনেছেন।

আইসিইউতে বাড়তি সতর্কতা

সাধারণ ওয়ার্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র—আইসিইউতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী এক নার্স জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে আইসিইউতে থাকা রোগীদের নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।

তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে। ফলে লোডশেডিং শুরু হলেই রোগীদের পর্যবেক্ষণ ও দেখভালে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

হাসপাতালের নার্সরা জানান, এ সময় অনেক রোগীর স্বজনও সহযোগিতা করেন। কেউ কেউ রোগীর জন্য চার্জার ফ্যান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসেন।

জ্বালানি না থাকায় চলছে না জেনারেটর

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, মেডিসিন বিভাগের ভবনে লোডশেডিংয়ের সময় বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটর প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেটি নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, হাসপাতালের মূল ভবনে দুটি বিদ্যুৎ লাইন থাকায় সেখানে তেমন লোডশেডিং হয় না। কিন্তু মেডিসিন বিভাগের ভবনে একটি মাত্র বিদ্যুৎ লাইন থাকায় সেখানে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

তিনি বলেন, মেডিসিন বিভাগের জেনারেটর চালানোর জন্য প্রতিদিন ১০০ লিটার করে তেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকে তেল বাবদ কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয় না।

হাসপাতাল পরিচালক বলেন, রোগীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় থেকে জ্বালানি বাবদ বরাদ্দ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গণপূর্ত বিভাগ থেকে তেল পাওয়া যায়নি। তেল পাওয়া গেলে জেনারেটর চালু করে লোডশেডিংয়ের সময় বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তেলের বরাদ্দ নেই: গণপূর্ত বিভাগ

বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম জানান, হাসপাতালের জেনারেটর পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে তেল বাবদ কোনো টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় না। তবে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে ঠিকাদারের মাধ্যমে জেনারেটর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ করা হবে। তবে কবে নাগাদ সেই বরাদ্দ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম

বরিশাল বিদ্যুৎ গ্রিড লাইনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তারা জানান, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মূল ভবনে দুটি বিদ্যুৎ লাইন থাকায় সেখানে লোডশেডিং তুলনামূলক কম। কিন্তু মেডিসিন বিভাগের পাঁচতলা ভবনে একটি লাইন থাকায় সরবরাহ ঘাটতির সময় ওই ভবনে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

চিকিৎসাসেবায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ চিকিৎসাসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত শর্ত। বিশেষ করে মেডিসিন বিভাগের মতো জায়গায় যেখানে শ্বাসকষ্ট, হৃদ্‌রোগসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি থাকেন, সেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে রোগীদের শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি বাড়তে পারে।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিকল্প জ্বালানির ঘাটতি। ফলে একটি ভবনের শত শত রোগীকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, মেডিসিন ভবনে একক বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি না থাকায় তৈরি হওয়া এই সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা। তাদের প্রত্যাশা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ রোগীদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

সারকথা: বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একটি পাঁচতলা ভবনে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। সেখানে প্রায় ৪০০ রোগী ও পাঁচ শতাধিক স্বজন অবস্থান করেন। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি সংকটে তা চালানো যাচ্ছে না। ফলে প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ রোগীদের স্বস্তি দিতে স্বজনদের হাতে উঠে এসেছে হাতপাখা ও চার্জার ফ্যান।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!