ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

menu

আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির গতি সাড়ে তিন গুণ

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির গতি সাড়ে তিন গুণ

ছবিঃ সংগৃহীত

বেতন বাড়ছে, কিন্তু বাড়ছে না স্বস্তি। নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ সামলাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের উপার্জন। একসময় যাঁরা সামান্য হলেও সঞ্চয় করতে পারতেন, তাঁদের অনেকেই এখন সংসারের খরচ মেটাতে ধারদেনা করছেন। কেউ খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিচ্ছেন, কেউ সন্তানের ওষুধ কিনতে পারছেন না, আবার কেউ পরিবারের বয়স্ক সদস্যের চিকিৎসার ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাজধানীর পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল ইসলামের অভিজ্ঞতা এ সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। গত দুই বছরে তাঁর মাসিক আয় সাত থেকে আট হাজার টাকা বেড়ে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু আয় বাড়লেও সংসারে স্বস্তি ফেরেনি। সরকারি একটি সংস্থায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত উজ্জ্বলের উপার্জনের প্রায় পুরোটাই চলে যায় সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে। ফলে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই তাঁকে ধারদেনা করে চলতে হয়।

মা, স্ত্রী ও ছোট ভাইকে নিয়ে তাঁর সংসার। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সামলাতে গিয়ে কমাতে হয়েছে মৌলিক প্রয়োজনের খরচও। আগে নিয়মিত মাছ-মাংস কিনতে পারলেও এখন তা কমিয়ে দিয়েছেন। আর্থিক টানাপোড়েনে মায়ের চিকিৎসার ব্যয়ও ছাঁটাই করতে হচ্ছে তাঁকে।

শুধু উজ্জ্বল নন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাবিবুল হাসান ও মাহমুদ জামিলের মতো অনেক চাকরিজীবীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁদের বেতন বেড়েছে, কিন্তু সংসারের ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে দ্রুতগতিতে। ফলে সঞ্চয় তো হচ্ছেই না, উল্টো দৈনন্দিন খরচ চালাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যেও উঠে এসেছে পরিবারের আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান। জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ গড়ে আয়ের চেয়ে মাসিক ব্যয় ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি।

২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। ওই বছর পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। তিন বছরে গড় মাসিক আয় বেড়েছে ১ হাজার ৯১ টাকা। অন্যদিকে ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৮১১ টাকা। অর্থাৎ এই সময়ে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ আয় বৃদ্ধির তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান দীর্ঘদিন চলতে থাকলে পরিবারগুলোকে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হয়। একই সঙ্গে সঞ্চয় কমে গিয়ে ঋণনির্ভরতা বাড়ে। এতে শুধু পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাই দুর্বল হয় না, দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বেতন বাড়লেও সংসারের হিসাব মেলে না

পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকায় বসবাসকারী উজ্জ্বল ইসলামের মাসিক আয় এখন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। দুই বছর আগে তাঁর আয় ছিল এর চেয়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা কম। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় বাড়ায় আয় বৃদ্ধির সুফল তাঁর পরিবার পাচ্ছে না।

উজ্জ্বল জানান, নতুন বাসায় ওঠার এক বছরও হয়নি বলে এখনো বাড়িভাড়া বাড়েনি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত জুলাইয়ে তাঁর বিদ্যুৎ বিল ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। আগস্ট থেকে তা বেড়ে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকার মধ্যে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

তাঁর ভাষ্য, তেল, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ক্রমাগত বাড়ছে। আগে যেখানে মাসিক বাজার খরচ ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে রাখা যেত, এখন তা বেড়ে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে ৩৫০ টাকায় যে রুই মাছ কেনা যেত, এখন একই মাছ কিনতে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।

উজ্জ্বল বলেন, মাসিক আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি বাসাভাড়া ও বাজার খরচে চলে যায়। এর বাইরে চিকিৎসা, বিদ্যুৎ বিল এবং অফিসে যাতায়াতের খরচ রয়েছে। গুলশান-২ এলাকায় অফিসে যেতে প্রতিদিন গণপরিবহন ব্যবহার করতে হয়। সময়মতো বাস না পেলে বিকল্প বাহন নিতে হয়, যা যাতায়াতের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে মাস শেষে তাঁর খরচ ৩৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে আয় দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সঞ্চয় করার সুযোগ না থাকায় উল্টো প্রতি মাসে ঋণ করতে হচ্ছে তাঁকে।

উজ্জ্বলের সংসারে আর্থিক সংকটের প্রভাব পড়েছে খাবার ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনেও। আগে নিয়মিত মাছ-মাংস কেনা হলেও এখন তা কমিয়ে দিতে হয়েছে। নিজের চিকিৎসাও ঠিকমতো করাতে পারছেন না। অর্থের অভাবে মায়ের চিকিৎসার ব্যয় কমাতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

উজ্জ্বল বলেন, সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে খাওয়ার অভ্যাস বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর কাছে এখন চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যয়ও বিলাসিতা মনে হয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চাকরি হারালে কিংবা পরিবারের কারও বড় ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে ধারদেনা করে বড়জোর এক থেকে দেড় মাস চলা সম্ভব হবে। এর বেশি সময় সংসার চালানোর মতো সঞ্চয় তাঁর হাতে নেই।

সন্তানের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হাবিবুল

বেসরকারি একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাবিবুল হাসানের সংসারেও একই চিত্র। স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবাকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার তাঁর। গত দুই বছরে মাসিক বেতন প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেড়ে ৩০ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে তাঁর হিসাবে সংসারের খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

একসময় বেতন থেকে নিয়মিত পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ সঞ্চয় করতে পারতেন হাবিবুল। এখন সেই সুযোগ নেই। বাসাভাড়া, বাজার ও সন্তানের পেছনে পুরো আয় ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষ সপ্তাহে সংসার চালাতে তাঁকে ঋণ করতে হচ্ছে।

কয়েক মাস আগে দেড় বছরের সন্তানের অস্ত্রোপচারের খরচ মেটাতে গিয়ে জমানো টাকা শেষ হয়ে যায়। এরপরও প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি থাকায় ঋণ নিতে হয় তাঁকে। সেই ঋণ পরিশোধের চাপ এখন দৈনন্দিন সংসার খরচেও প্রভাব ফেলছে।

হাবিবুলের ভাষ্য, ঋণের কিস্তি ও সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে ঠিকমতো বাজার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি টাকার অভাবে গত মাসে সন্তানের ওষুধও কিনতে পারেননি তিনি।

তিনি বলেন, আগে বেতন থেকে কিছু টাকা জমাতে পারলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ অনেক সময় কারও কাছে সাহায্য চাইতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে নিজেদের কষ্ট নিজেরাই সামলানোর চেষ্টা করেন।

হাবিবুলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারে বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয় কীভাবে দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। একবার সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী মাসগুলোর ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হয়। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়।

ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম মাহমুদ জামিলের

স্ত্রী ও চার ছেলেকে নিয়ে মাহমুদ জামিলের ছয় সদস্যের সংসার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। ব্যয়বহুল বাসাভাড়া এড়াতে গাজীপুর থেকে প্রতিদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় অফিসে যাতায়াত করেন।

দুই বছর আগে তাঁর মাসিক বেতন ছিল ২৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু বেতন বাড়লেও পরিবারের ব্যয় সামলাতে পারছেন না তিনি। মাস শেষ হওয়ার আগেই ধারদেনা করতে হচ্ছে।

চলতি বছর দুই ছেলের স্কুলের খরচ নতুন করে সংসারের ব্যয়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। স্কুল ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতেই তাঁর মাসিক বেতনের প্রায় ৪০ শতাংশ চলে যায়। এর বাইরে জমজ দুই ছেলের জন্য দুধ কিনতে হয়। গ্রামে থাকা মাকে প্রতি মাসে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা পাঠান তিনি।

সব খরচ মেটানোর পর পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ হাতে থাকে না। সন্তানদের অনেক আবদারও পূরণ করতে পারছেন না বলে জানান মাহমুদ।

তিনি বলেন, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তখন খরচ বাঁচাতে ডাল-সবজি খেয়েই দিন পার করতে হয়। সন্তানদের জন্য মাঝেমধ্যে ব্রয়লার মুরগি কেনা হলেও দাম বাড়ায় এখন তা কমিয়ে দিয়েছেন।

মাহমুদের মতে, গত দুই বছরে বেতন প্রায় ১০ হাজার টাকা বাড়লেও তাঁর হিসাবে সংসারের খরচ বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। যাতায়াত, খাবার, ওষুধ ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বাড়তে থাকায় সঞ্চয়ের সুযোগ নেই। একজন বাবা হিসেবে সন্তানদের সাধারণ চাহিদাও পূরণ করতে না পারার কষ্ট তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।

বিবিএসের জরিপে আয়-ব্যয়ের বড় ব্যবধান

চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিবিএসের ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এ পরিবারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধানের চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। ফলে একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি ব্যয় করছে।

অঞ্চলভেদে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যান্য শহরাঞ্চলে এ ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৩২ হাজার টাকা।

সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো খাতে ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও সেখানকার পরিবারের আয়ও সীমিত। ফলে মৌলিক চাহিদা পূরণে গ্রামীণ পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গ্রামাঞ্চলের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। অন্যান্য শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। সিটি করপোরেশন এলাকায় ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।

অর্থাৎ, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গ্রামীণ পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। শহরাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি।

পরিবারের ব্যয়ের খাতভিত্তিক চিত্রেও আঞ্চলিক পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খাদ্য খাতে ব্যয় হয়। গ্রামাঞ্চলে খাদ্য খাতে ব্যয়ের অনুপাত বেশি। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয়ের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত খাতে চলে যায়।

খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবা, যাতায়াত, চিকিৎসা এবং শিক্ষার ব্যয় রয়েছে। এসব খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলোর খাদ্য ও পুষ্টির জন্য বরাদ্দ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ

২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপের সঙ্গে ২০২৫ সালের তথ্য তুলনা করলে পারিবারিক অর্থনীতির চাপ আরও স্পষ্ট হয়।

২০২২ সালে পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকায়। অর্থাৎ তিন বছরে গড় মাসিক আয় বেড়েছে ১ হাজার ৯১ টাকা।

অন্যদিকে ২০২২ সালে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। তিন বছরে ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৮১১ টাকা।

অর্থাৎ এই সময়ে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ আয় বৃদ্ধির তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ। এই ব্যবধানের কারণে অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে কিংবা ঋণ নিতে হচ্ছে।

তবে জাতীয় পর্যায়ের গড় আয় ও ব্যয়ের তথ্য সব পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতি একভাবে তুলে ধরে না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, বসবাসের এলাকা এবং প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ধরন অনুযায়ী চাপের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তা সত্ত্বেও আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ার চিত্র নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

‘সঞ্চয় ভাঙছেন, আবার পুরোনো ঋণ শোধে নতুন ঋণ নিচ্ছেন’

মানুষের আয় বাড়লেও ব্যয়ের গতি তার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, দেশের বহু পরিবারের বর্তমান আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিবারের গড় মাসিক আয় ১ হাজার ৯১ টাকা বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৮১১ টাকা। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন গুণ।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক খাতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের ওপর।

গ্রামাঞ্চলে মৌলিক ব্যয় মেটাতে ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবারের ঋণ নেওয়ার তথ্যকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার পরিবারগুলোও আর্থিক চাপের বাইরে নয়।

তাঁর ভাষ্য, অনেক পরিবারের হাতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় নেই। ফলে কেউ ধারদেনা করছেন, কেউ জমানো অর্থ ভাঙছেন, আবার কেউ পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে নতুন ঋণ নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদ বলেন, এভাবে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবারের আয়ের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে। তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উৎপাদনশীল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যয় কমাতে বাধ্য হবে পরিবারগুলো। এতে পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সংকট মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়ের চাপ কমানো জরুরি বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা বাড়ানো, সাশ্রয়ী মূল্যে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং মানসম্মত সরকারি সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের বেতন ও মজুরি যেন জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জরুরি প্রয়োজনে পরিবারগুলো অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হয়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আয় ও কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবায় মানুষের ব্যয় কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্চয়হীনতার ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ

উজ্জ্বল ইসলাম, হাবিবুল হাসান ও মাহমুদ জামিলের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর সংকট এখন শুধু মাসের খরচ মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা, পুষ্টি, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

যে পরিবারগুলো আগে নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারত, তাদের অনেকেই এখন ধারদেনা করে চলেছে। হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা বড় কোনো পারিবারিক ব্যয় দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, সঞ্চয় না থাকলে এমন সংকট মোকাবিলায় নতুন ঋণ নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না।

বিবিএসের জরিপে উঠে আসা আয়-ব্যয়ের ব্যবধান এবং ঋণ নেওয়ার হার এ পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমাতে শুধু আয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা এবং মৌলিক সেবার ব্যয় সাশ্রয়ী করাও জরুরি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় যদি আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছানো কঠিন হবে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য স্বস্তি ফেরাতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারগুলোর সঞ্চয় গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!