ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ইইউর ডেনিম বাজারে শীর্ষে বাংলাদেশ, আগস্টে রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭১ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

ইইউর ডেনিম বাজারে শীর্ষে বাংলাদেশ, আগস্টে রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭১ শতাংশ

ছবিঃ সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে ডেনিম বা জিন্স পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মোট মূল্য কমলেও আগস্টে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ। বাজারের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি এই বৃদ্ধি দেশের ডেনিম শিল্পের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইইউর আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলো মোট ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ২২ লাখ ইউরো। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইইউর ডেনিম আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।

তবে সামগ্রিক বাজারে আমদানি কমলেও আগস্ট মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ওই মাসে ইইউর ডেনিম আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ১ লাখ ইউরোতে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। কয়েক মাসের মন্দার পর এই প্রবৃদ্ধি ইউরোপের ডেনিম বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তুলে ধরছে।

ইইউর ডেনিম বাজারের ২৯.৪০ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো প্রথম। চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করা হয়েছে। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এ সময়ে পাকিস্তান থেকে ইইউর ডেনিম আমদানির মূল্য ছিল ৫২ কোটি ৫৪ লাখ ইউরো। আর তুরস্ক থেকে আমদানি হয়েছে ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ইউরোর ডেনিম।

তবে শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখলেও বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছে। এর ফলে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও রপ্তানি কমার চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন

প্রথম আট মাসের সামগ্রিক চিত্রে রপ্তানি কমলেও আগস্টে বাংলাদেশের ডেনিম খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানির মূল্য ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ইউরোতে পৌঁছেছে।

এ সময়ে ইইউর মোট ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। আগস্টে ইইউর ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বেড়ে ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিতে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ পতন ছিল। আগস্টের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ফলে আট মাসের হিসাবে সেই পতন কমে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

এতে বোঝা যায়, ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার মধ্যেও বাংলাদেশ আগস্টে তুলনামূলক ভালো করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে কি না, তা নির্ভর করবে ক্রেতাদের চাহিদা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ সক্ষমতার ওপর।

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে রপ্তানিতে ভিন্ন চিত্র

ইউরোপের ডেনিম বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় ইইউর বাজারে দেশটির অবস্থান চাপে পড়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তুরস্ক থেকে ডেনিম আমদানি ১১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো বা ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ কমেছে বলে দেওয়া পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মরক্কো থেকে আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং তিউনিসিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

অন্যদিকে কয়েকটি দেশ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। মিসর থেকে ডেনিম আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং চীন থেকে বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। ভিয়েতনাম থেকেও আমদানি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কারও রপ্তানি কমছে, আবার কারও বাড়ছে—এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের রপ্তানি কমার কারণে তৈরি হওয়া বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও বেশি ক্রয়াদেশ পেতে পারে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় শুধু বিদ্যমান অবস্থান ধরে রাখাই নয়, পণ্যের মান ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

উচ্চমূল্যের ডেনিম ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

বাংলাদেশের ডেনিম খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিএভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশ বরাবরই ভালো অবস্থানে রয়েছে।

বাংলানিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমানে পুরো ইউরোপের বাজারেই ডেনিমের রপ্তানি কিছুটা কম রয়েছে। এ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের ডেনিম ইইউর মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি অংশ দখলে রেখে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এটি দেশের ডেনিম শিল্পের জন্য ইতিবাচক দিক।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ডেনিম পণ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়ানো এবং উন্নতমানের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা জোরদার করা গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি আরও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা যখন উন্নতমানের ও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে ঝুঁকবেন, তখন সেই চাহিদা পূরণে সক্ষম কারখানাগুলো বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পণ্যের মান, উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

জ্বালানি সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ

ডেনিম খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও গত এক-দুই মাসে এ খাতে কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যা না বাড়লে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের জন্য উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়লে উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা ও মান বজায় রেখে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা গেলে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের সামনে কী সম্ভাবনা?

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান দেশের ডেনিম শিল্পের শক্তিশালী ভিত্তির পরিচায়ক। তবে প্রথম আট মাসে রপ্তানি মূল্য ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

আগস্টের প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও এক মাসের ইতিবাচক ফলাফলকে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরবর্তী মাসগুলোতেও রপ্তানি বৃদ্ধির ধারা বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের ডেনিম উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোও রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশ এখনো শীর্ষ সরবরাহকারী। সামগ্রিক বাজারে মন্দার মধ্যেও আগস্টে রপ্তানি বৃদ্ধির ঘটনা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারলে দেশের ডেনিম শিল্পের রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!