ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

জাতিসংঘ দিবসে বিশ্বশান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

জাতিসংঘ দিবসে বিশ্বশান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত প্রধানমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অভিবাসন, ডিজিটাল বিভাজন ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র, সংস্থাটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তিনি।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বের বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এ বছরের জাতিসংঘ দিবস বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জনগণের বিপুল রায়ে সরকার গঠনের পর থেকেই তাঁর সরকার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে বহুপক্ষীয় নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে বড় সংকটগুলোর সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সংলাপ ও সমন্বিত উদ্যোগ। বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার প্রতিফলন।

প্রধানমন্ত্রীর মতে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে দেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ ও প্রত্যাশা তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাঁচ বছরমেয়াদি পরিকল্পনা

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সরকার সংস্কার ও উন্নয়নভিত্তিক পাঁচ বছরমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৈষম্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনি সংস্কারে অঙ্গীকার

মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণকে কেন্দ্রে রাখা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মানবাধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানো এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে মানবাধিকার সুরক্ষাকে সরকারের নীতি ও সংস্কার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে জাতিসংঘের ভূমিকার গুরুত্বও প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বক্তব্যে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ও শান্তি বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণের কথাও বাণীতে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এসব মিশন কাজ করে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছে। এ অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের অঙ্গীকার এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের অবদান অব্যাহত রাখার প্রত্যয় প্রকাশ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, ডিজিটাল বিভাজন, অভিবাসন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য অনেক দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে না পৌঁছানো এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলছে।

এসব সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে এসব সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন

ফিলিস্তিন সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি বাংলাদেশ সব সময় সংহতি প্রকাশ করে আসছে। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে।

দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মূল ধারণা হলো, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে অবস্থান করবে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানে এ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকার এবং সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব

রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসনকে সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের আশ্রয়, মানবিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এ জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের প্রত্যাশা আবারও সামনে এসেছে।

কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসংঘ গড়ার আহ্বান

বাণীর শেষাংশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিশ্রুতিশীল জাতিসংঘ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন, যেখানে সব দেশের মতামত ও স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পাবে এবং বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এই বাণীতে বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!