জাপানকে হারাতে পারলেই কাবাডিতে বাংলাদেশের পদক নিশ্চিত হতো। সেই আশায় মঙ্গলবার বিকেলে নাগোয়ার টোকাই ডরি ইনডোর স্টেডিয়ামে ভিড় করেছিলেন বাংলাদেশি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা। তবে জাপানের কাছে হেরে কাবাডিতে পদকের সমীকরণ যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখনই আসে স্বস্তির খবর—উশুতে পদক নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের জিন্নাত আক্তার।
নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির উশু ইভেন্টে সেমিফাইনালে উঠেছেন বাংলাদেশের এই অ্যাথলেট। উশুর নিয়ম অনুযায়ী, এশিয়ান গেমসে সেমিফাইনালে ওঠা প্রতিযোগীরা পদক নিশ্চিত করেন। ফলে সেমিফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই জিন্নাতের ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হয়েছে।
এটি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ ৪০ বছর পর কোনো ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক। এর আগে ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন।
প্রতিপক্ষ অযোগ্য হওয়ায় সেমিফাইনালে জিন্নাত
নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে মোট ১৫ জন প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছেন। নকআউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এ ইভেন্টের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিযোগী জিন্নাত আক্তার বাই পেয়েছিলেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেন্তিনা থারিসা। তবে ওজন নির্ধারণের পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমার বেশি ওজন হওয়ায় ফ্লোরেন্তিনাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
ফলে জিন্নাতকে কোয়ার্টার ফাইনালে লড়াই করতে হয়নি। প্রতিপক্ষ অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় সরাসরি সেমিফাইনালে জায়গা করে নেন বাংলাদেশের এই উশু খেলোয়াড়।
সেমিফাইনালে হারলেও ব্রোঞ্জ
বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও দলটির কোচ দিলদার হাসান দিলু জানান, এশিয়ান গেমসের নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনালে ওঠা প্রতিযোগীরা ব্রোঞ্জ পদক পান।
তিনি বলেন, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে জিন্নাতের প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী ফ্লোরেন্তিনা থারিসা ওভার ওয়েট ছিলেন। এজন্য সে ডিসকোয়ালিফাইড হওয়ায় আমাদের জিন্নাত সেমিফাইনালে ওঠার পাশাপাশি ব্রোঞ্জ জিতেছে।’
দিলদার হাসান আরও জানান, প্রতিযোগীর সংখ্যা কম হলে কিছু ক্ষেত্রে ব্রোঞ্জ পদকের জন্য আলাদা ম্যাচ হতে পারে। তবে এবারের এই ইভেন্টে ১৫ জন প্রতিযোগী থাকায় সেমিফাইনালে পরাজিত দুই প্রতিযোগীই ব্রোঞ্জ পদক পাবেন।
তার ভাষায়, ‘ছয় জনের কম হলে ব্রোঞ্জের জন্য আলাদা ম্যাচ হয়। এই ইভেন্টে ১৫ জন প্রতিযোগী, তাই সেমিফাইনালে পরাজিত খেলোয়াড়রাও ব্রোঞ্জ পাবে।’
আয়োজকদের নিয়মও নিশ্চিত করেছে পদক
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদও জিন্নাতের পদক নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘উশুর সাধারণ সম্পাদক পদকের বিষয়টি আমাদের রিকনফার্ম করেছে। এশিয়ান গেমসে সেমিফাইনালিস্ট পদক পায়। জিন্নাতের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়েছে, সেই হিসেবে পদকও নিশ্চিত বলা যায়। আয়োজক কমিটির সঙ্গে এখনও আলাপ হয়নি, তবে পদক নিশ্চিত।’
অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষের অযোগ্যতার কারণে জিন্নাত সরাসরি সেমিফাইনালে উঠেছেন এবং সেমিফাইনালে তার ফল যাই হোক, বাংলাদেশের পদক নিশ্চিত।

চার দশক পর ব্যক্তিগত পদক
বাংলাদেশ ১৯৭৮ সাল থেকে এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত ইভেন্টে দেশের পদকের সংখ্যা খুবই সীমিত।
১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। সেটিই ছিল এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের সর্বশেষ পদক।
এরপর বাংলাদেশ কাবাডি ও ক্রিকেটের মতো দলীয় ডিসিপ্লিনে পদক পেয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত কোনো ইভেন্টে আর পদক আসেনি।
জিন্নাতের ব্রোঞ্জ নিশ্চিত হওয়ার ফলে প্রায় চার দশক পর এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত ইভেন্টে আবারও পদক যোগ হতে যাচ্ছে।
লড়াই ছাড়াই পদক, সামনে সেমিফাইনাল
জিন্নাতের পদক নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি কিছুটা ব্যতিক্রমী। কারণ, কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষের অযোগ্যতার কারণে তাকে ম্যাচে অংশ নিতে হয়নি। তবে পদক নিশ্চিত হলেও প্রতিযোগিতা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
সেমিফাইনালে জিন্নাত লড়বেন আরও একটি ম্যাচে। সেখানে জয় পেলে তিনি স্বর্ণ বা রুপার পদকের লড়াইয়ে যেতে পারবেন। আর সেমিফাইনালে পরাজিত হলে ব্রোঞ্জ পদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তাকে।
তবে ম্যাচে নামার আগেই বাংলাদেশের ঝুলিতে একটি পদক নিশ্চিত হওয়ায় এশিয়ান গেমসে দেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
কাবাডির অনিশ্চয়তার মধ্যেই উশুতে স্বস্তি
জিন্নাতের পদকের খবরটি আসে কাবাডিতে বাংলাদেশের পদকের সমীকরণ জটিল হওয়ার পর। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জিতলেই পদক নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু জাপানের কাছে পরাজয়ের পর কাবাডির পদক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এর মধ্যেই উশু থেকে পদক নিশ্চিত হওয়ার খবর বাংলাদেশ দলের কর্মকর্তা ও সমর্থকদের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ফলে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক তালিকায় আবারও একটি ব্যক্তিগত ইভেন্টের নাম যুক্ত হতে যাচ্ছে। চার দশকের অপেক্ষার পর জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে উশুতে বাংলাদেশের এই অর্জন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে।

