একসময় ছিলেন প্রতিপক্ষ। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে মাঠে নেমে বার্সেলোনার হয়ে লিওনেল মেসির জাদু থামানোর চেষ্টা করেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা কাসেমিরো। সময়ের পরিবর্তনে সেই মেসিই এখন তার সতীর্থ। আর সতীর্থ হিসেবে আর্জেন্টাইন মহাতারকার পারফরম্যান্স দেখে যেন নতুন করে মুগ্ধ হয়ে গেলেন কাসেমিরো।
সিএফ মন্ট্রিলের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির দুর্দান্ত ৭-১ গোলের জয়ে মেসির চার গোলের পারফরম্যান্সের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ব্রাজিলের এই তারকা মিডফিল্ডার। কাসেমিরোর মতে, বয়স কিংবা সময়—কোনোটিই মেসির শ্রেষ্ঠত্ব কেড়ে নিতে পারেনি। তার চোখে মেসিই এখনও বিশ্বের সেরা ফুটবলার।
মন্ট্রিলের বিপক্ষে ম্যাচে মেসির পারফরম্যান্স ছিল এক কথায় অসাধারণ। একের পর এক গোল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কার্যত অচল করে দেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। তার চার গোলের পাশাপাশি ইন্টার মায়ামির বড় ব্যবধানের জয়ে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সও ছিল দারুণ।
মেসির এমন পারফরম্যান্সের পর কাসেমিরো বলেন, মেসি দলে থাকা মানেই বিশেষ কিছু। তার মতো একজন কিংবদন্তির সঙ্গে একই দলে খেলার সুযোগ পাওয়া এবং তার এমন পারফরম্যান্স কাছ থেকে দেখা নিজেদের জন্য উপভোগের বিষয়।
কাসেমিরোর ভাষায়, ‘মেসি দলে থাকা মানে এটাই। আমাদের এই মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে হবে, কারণ সে এমন একজন মানুষ ও খেলোয়াড়, যে ইতিহাস তৈরি করে। আজ আমরা যা দেখলাম, আমাদের অবশ্যই উপভোগ করতে হবে এবং তাকে সমর্থন করে যেতে হবে।’
শুধু প্রশংসা করেই থামেননি কাসেমিরো। মেসিকে সরাসরি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবেও অভিহিত করেছেন তিনি। ব্রাজিলিয়ান এই মিডফিল্ডারের মতে, মেসি এখনও এমন এক পর্যায়ের খেলোয়াড়, যার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যেমন কঠিন, তেমনি তার সঙ্গে খেলার সুযোগ পাওয়াও বিশেষ অভিজ্ঞতা।
তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে, কারণ সে এখনও সেরা। বিশ্বকাপে সেটার প্রমাণ দিয়েছে সে। তার সঙ্গে আমাদের সেটা উপভোগ করতে হবে, কারণ তার সঙ্গে আমরা সত্যিই অনেক বেশি শক্তিশালী।’
প্রতিপক্ষ থেকে সতীর্থ
কাসেমিরো ও মেসির ফুটবলীয় সম্পর্কের গল্পটিও বেশ দীর্ঘ। দীর্ঘ সময় ধরে দুজন ছিলেন স্প্যানিশ ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
রিয়াল মাদ্রিদের মাঝমাঠে কাসেমিরো এবং বার্সেলোনার আক্রমণভাগে মেসি—দুজনের লড়াই ছিল এল ক্লাসিকোর অন্যতম আকর্ষণ। ক্লাব পর্যায়ে তাদের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও একাধিকবার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মাঠে তখন লক্ষ্য ছিল একে অপরকে হারানো; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন পরিণত হয়েছে সতীর্থতার সম্পর্কে।
ক্লাব ও দেশের হয়ে কাসেমিরো ও মেসি এখন পর্যন্ত ২০ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন। এসব ম্যাচে দুজনই আটটি করে জয় পেয়েছেন, আর চারটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানেও তাদের দ্বৈরথ ছিল প্রায় সমানে সমান।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে মায়ামি
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চলতি গ্রীষ্মে ফ্রি ট্রান্সফারে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন কাসেমিরো। যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন তিনি।
মায়ামির হয়ে এখন পর্যন্ত ৯টি ম্যাচ খেলেছেন ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার। এর মধ্যে ছয়টি ম্যাচেই মেসির সঙ্গে একই মাঠে খেলেছেন তিনি। আগে যাকে থামানোর জন্য কৌশল সাজাতে হতো, এখন তাকেই বল পাস দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করছেন কাসেমিরো।
মেসি-কাসেমিরোর এই নতুন সম্পর্ক ইন্টার মায়ামির সমর্থকদের জন্যও বাড়তি আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। একজন বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়, অন্যজন মাঝমাঠের অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী রক্ষণাত্মক খেলোয়াড়—দুজনের সমন্বয় মায়ামির শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের পরও মেসির শ্রেষ্ঠত্ব
মেসিকে বিশ্বের সেরা বলার ক্ষেত্রে কাসেমিরোর সবচেয়ে বড় যুক্তি তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্সকে সামনে এনেছেন তিনি।
কাসেমিরোর বক্তব্যে স্পষ্ট, মেসির বয়স নিয়ে আলোচনা থাকলেও মাঠের পারফরম্যান্সই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার পর ক্লাব ফুটবলেও মেসি যে একই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন, সেটিই তাকে মুগ্ধ করেছে।
ইন্টার মায়ামির হয়ে মেসির চার গোলের পারফরম্যান্স যেন কাসেমিরোর সেই বিশ্বাসকেই আরও শক্তিশালী করেছে। প্রতিপক্ষ হিসেবে বছরের পর বছর মেসির সামর্থ্য দেখেছেন তিনি। এবার সতীর্থ হয়ে কাছ থেকে দেখছেন তার ফুটবলীয় জাদু।
মেসিকে নিয়ে কাসেমিরোর মন্তব্য তাই শুধু একজন সতীর্থের প্রশংসা নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে পাওয়া এক বিশেষ স্বীকৃতিও। সময় বদলেছে, জার্সি বদলেছে, সম্পর্কের ধরন বদলেছে—কিন্তু কাসেমিরোর চোখে মেসির শ্রেষ্ঠত্বে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

