রুদ্ধশ্বাস এক ফাইনাল, গোলশূন্য ১০৫ মিনিট, এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অবিশ্বাস্য সব সেভ আর শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করল স্পেন। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে লা রোহা।
লিওনেল মেসির নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনের দাপুটে ফুটবল এবং শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেসের দুর্দান্ত ফিনিশে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
মার্টিনেজ ছিলেন আর্জেন্টিনার একমাত্র ভরসা
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ সৃষ্টিতে স্পষ্ট আধিপত্য দেখায় স্পেন। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
তবে স্পেনের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। অসাধারণ রিফ্লেক্স ও দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ে একের পর এক নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দেন তিনি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১০টি সেভ করে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে নতুন রেকর্ডও গড়েন এই বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক।
তার অসাধারণ পারফরম্যান্সেই দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকে ছিল আর্জেন্টিনা।
লাল কার্ডে কঠিন চাপে পড়ে আর্জেন্টিনা
নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে আর্জেন্টিনা বড় ধাক্কা খায়। স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বেপরোয়া ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন মিডফিল্ডার এনসো ফার্নান্দেজ।
ফলে অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা একজন কম নিয়ে খেলতে হয় লিওনেল স্কালোনির দলকে। এতে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় স্পেনের হাতে।

১০৬ মিনিটে ইতিহাস গড়লেন ফেরান তোরেস
ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই।
১০৬ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দারুণ একটি আক্রমণের সূচনা করেন পেদ্রো পোরো। তার নিখুঁত ক্রস দূরের পোস্টে হেড করে খেলায় রাখেন নিকো উইলিয়ামস। ফিরতি বল বক্সের ভেতরে পেয়ে কোনো ভুল করেননি বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস। জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে এগিয়ে দেন তিনি।
গোল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম। অন্যদিকে হতাশায় ভেঙে পড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকরা।
মেসির শেষ চেষ্টা ব্যর্থ
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু একজন কম নিয়ে খেলায় তাদের আক্রমণ খুব একটা কার্যকর হয়ে ওঠেনি।
ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে লিওনেল মেসি দূরপাল্লার শটে গোলের চেষ্টা করলেও স্পেনের রক্ষণভাগ তা ব্লক করে দেয়। সেটিই ছিল পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো সুযোগ তৈরি করতে না পারায় শিরোপা হাতছাড়া হয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
টানা দুই শিরোপার স্বপ্ন ভাঙল
১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, দৃঢ় রক্ষণ এবং কার্যকর আক্রমণের সামনে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না।
পুরো ম্যাচে স্পেন ছিল অধিক সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক। বলের দখল, পাসিং, সুযোগ সৃষ্টি—সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা।
১৪ বছর পর আবারও বিশ্বসেরা স্পেন
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে মেতে ওঠেন স্পেনের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও হাজারো সমর্থক। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি নিজেদের করে নিল লা রোহা।
এই শিরোপার মাধ্যমে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্ব ফুটবলেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিল স্পেন।

