বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন বর্তমান ও সাবেক একাধিক তারকা ফুটবলার। ফিফার বিভিন্ন কনফেডারেশনের সঙ্গে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন ও বিতর্কের মধ্যেই খেলোয়াড়দের এমন প্রকাশ্য অবস্থান ইনফান্তিনোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
ফিফা প্লেয়ার্স ভয়েস প্যানেলের পক্ষে সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার মিকায়েল সিলভেস্ত্রে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে বিবৃতিটি প্রকাশ করেন তিনি। পোস্টটির শেষ দিকে জোরালো ভাষায় লেখা হয়—‘যথেষ্ট হয়েছে।’
সিলভেস্ত্রের প্রকাশ করা ওই বার্তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সমর্থন জানিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইংল্যান্ডের দুইবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন লুসি ব্রোঞ্জ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের সাবেক মিডফিল্ডার এমানুয়েল পেতিত।
ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ খেলোয়াড়দের
বিবৃতিতে খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলভক্তের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, খেলোয়াড়রাও একই উদ্বেগ অনুভব করছেন। তাদের অভিযোগ, ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে ফুটবল তার ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও মূল চেতনা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া বা নেওয়ার পরিকল্পনা করার সময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ করা হচ্ছে না। এমনকি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে বিবেচিত সমর্থকদের মতামতও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের ভাষ্য, ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যারা মাঠে খেলেন এবং যারা গ্যালারি ও টেলিভিশনের সামনে থেকে খেলাটিকে বাঁচিয়ে রাখেন—উভয় পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
‘ক্ষমতা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে’
ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের সমালোচনা করতে গিয়ে বিবৃতিতে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পরিবর্তন অপরিহার্য। ক্ষমতা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। তার নিজস্ব স্বার্থ এবং ফুটবলের জন্য যা সর্বোত্তম, তার মধ্যে পার্থক্য করার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছেন।’
এ ধরনের মন্তব্য ফিফা প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত খেলোয়াড়দের সবচেয়ে সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। বিশ্ব ফুটবলের সব অংশীজনকে সামনে এসে খেলাটির ভবিষ্যৎ নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্ক
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের অন্যতম কারণ ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর অংশীদারত্ব ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তার সাম্প্রতিক পরিকল্পনা। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার অংশীদারত্ব বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
বিশেষ করে উয়েফার সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন ওই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেন। পরবর্তীতে ইনফান্তিনো সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
তবে এ ঘটনা ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা এবং ফুটবলের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংস্থাটির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কনফেডারেশনগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই খেলোয়াড়দের অবস্থান
ফিফা প্রেসিডেন্টের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বিভিন্ন কনফেডারেশনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে। এর মধ্যেই খেলোয়াড়দের একটি অংশ প্রকাশ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তোলায় বিতর্কের মাত্রা আরও বেড়েছে।
ফিফার মতো একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। নতুন প্রতিযোগিতা আয়োজন, খেলোয়াড়দের সূচি, ক্লাব ও জাতীয় দলের স্বার্থ, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং ফুটবলের ভবিষ্যৎ কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই ফিফার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই খেলোয়াড়দের অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মাঠের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ভবিষ্যতে আরও বিরোধ তৈরি হতে পারে।
‘চুপ থাকা অসম্ভব’
বিবৃতির শেষ অংশে খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আর চুপ করে থাকা সম্ভব নয়।
তারা বিশ্ব ফুটবলের সব অংশীজনকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য—ফুটবলের ভবিষ্যৎ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু করা এবং খেলাটির মৌলিক মূল্যবোধ, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য এটি নিঃসন্দেহে নতুন এক চাপের অধ্যায়। কনফেডারেশনগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের পর এবার খেলোয়াড়দের প্রকাশ্য অনাস্থা তার নেতৃত্বকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। সামনে ফিফা কীভাবে এই অভিযোগ ও সমালোচনার জবাব দেয়, সেটিই এখন বিশ্ব ফুটবল মহলের অন্যতম আলোচনার বিষয়।

