প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে থেকেও জন্মভূমি ও গ্রামের মানুষের প্রতি ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বাহরাইনপ্রবাসী মোঃ আমিন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার জানিয়েও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা নিজের উপার্জিত অর্থে শ্রমিক নিয়োগ করে সংস্কার করেছেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগে মকন্দপুর, আংড়া ও রামপুরা গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচবিবি উপজেলার ৫ নম্বর আটাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আংড়া গ্রাম থেকে মাঝিনা মোড় পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। রাস্তাজুড়ে ছিল অসংখ্য খানাখন্দ ও বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদাপানিতে একাকার হয়ে যেত পুরো সড়ক। ফলে বর্ষা মৌসুমে এ পথ দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো স্থানীয়দের।
বিশেষ করে কৃষকদের জন্য রাস্তাটি ছিল বড় দুর্ভোগের কারণ। মাঠ থেকে আমন ধান কেটে বাড়িতে নেওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হতো তাঁদের। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারীদেরও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো।
জনপ্রতিনিধিদের কাছে জানিয়েও মেলেনি সমাধান
আংড়া থেকে মাঝিনা মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি মকন্দপুর, আংড়া ও রামপুরা গ্রামের মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে রাস্তাটির অবস্থা খারাপ হলেও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাস্তাটি সংস্কারের জন্য তাঁরা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান না হওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ চলতেই থাকে। একপর্যায়ে গ্রামের মানুষের এই কষ্টের কথা আংড়া গ্রামের সন্তান ও বাহরাইনপ্রবাসী মোঃ আমিনকে জানান তাঁরা।
২৫ থেকে ৩০ শ্রমিক নিয়ে সংস্কারকাজ
গ্রামবাসীর দুর্ভোগের কথা শুনে আর অপেক্ষা করেননি আমিন। নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক নিয়োগ করেন তিনি। তাঁদের নিয়ে নিজেও উপস্থিত থেকে মাটি কাটা, গর্ত ভরাট ও রাস্তা সংস্কারের কাজ তদারকি করেন।
তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও উদ্যোগে দীর্ঘদিনের বেহাল রাস্তাটি আবারও চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে। এতে তিন গ্রামের বাসিন্দাদের যাতায়াত সহজ হয়েছে। বিশেষ করে কৃষকদের মাঠের ফসল বাড়িতে নেওয়া এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে।
আমিনের উদ্যোগে খুশি এলাকাবাসী
স্থানীয় বাসিন্দা সাজাহান আলী বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে রাস্তাটির সমস্যার কথা জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। পরে আমিনের কাছে বিষয়টি জানালে তিনি নিজ উদ্যোগে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করে দিয়েছেন। এতে আমরা অনেক উপকৃত হয়েছি।”
একই গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, “রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে মাঠের আমন ধান কেটে বাড়িতে নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। রাস্তায় বড় বড় গর্ত ছিল। আমিন নিজের অর্থ ব্যয় করে রাস্তাটি সংস্কার করে দেওয়ায় আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ফেকা বলেন, “আমিন একজন ভালো মনের মানুষ। তিনি শুধু রাস্তা সংস্কারই করেন না, এলাকার অসহায় মানুষের বিপদে-আপদেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁর এমন উদ্যোগে গ্রামের মানুষ উপকৃত হয়েছে।”
মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার আমিনের
নিজ উদ্যোগে রাস্তা সংস্কারের বিষয়ে বাহরাইনপ্রবাসী মোঃ আমিন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই মানুষের পাশে থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও মনটা সবসময় এলাকার মানুষের কাছেই পড়ে থাকে। প্রবাসে থেকে যা উপার্জন করি, তা দিয়ে চেষ্টা করি এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে।”
তিনি আরও বলেন, “এই রাস্তাটি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ ছিল। আমার সামান্য প্রচেষ্টায় যদি মানুষের একটু উপকার হয়, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। ভবিষ্যতেও এলাকার উন্নয়নে ভালো যেকোনো কাজে পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।”
প্রবাসীর উদ্যোগে মানবিকতার দৃষ্টান্ত
প্রবাসে থেকেও নিজের এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আমিনের এমন উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, একটি রাস্তা সংস্কারের মাধ্যমে তিনি শুধু মানুষের যাতায়াতের সমস্যাই কমাননি, বরং গ্রামের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রবাসে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ নিজ এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করলে স্থানীয় পর্যায়েও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। বাহরাইনপ্রবাসী আমিনের এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি মানবিক উদাহরণ।
তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাস্তাটি সংস্কার হলেও এর স্থায়ী উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এতে তিন গ্রামের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি যাতায়াতের সমস্যা আরও কার্যকরভাবে সমাধান হবে।

