ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সৌদির কারখানায় আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে, স্বজনদের আহাজারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০২:৩২ পিএম

সৌদির কারখানায় আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে, স্বজনদের আহাজারি

ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষে শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাঁদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির পথে রয়েছে।

শনিবার সকাল ৯টার পর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজি ৩৩৬ সাত শ্রমিকের মরদেহ নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণ করতে স্বজনদের অপেক্ষার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের বাড়িতে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্তের পর দেশে আনা হলো মরদেহ

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। দুর্ঘটনার পর তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি সাতজনের মরদেহ শনাক্তে জটিলতা দেখা দেয়।

পরবর্তী সময়ে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ওই সাত শ্রমিকের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

এর আগে গত ২৭ আগস্ট একই দুর্ঘটনায় নিহত আরও নয় বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহই দেশে আনা হলো।

নওগাঁ ও নাটোরের সাত পরিবারে শোকের মাতম

সৌদি দূতাবাস থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, সর্বশেষ দেশে আনা সাতজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। তাঁরা হলেন হাসিবুল হাসান শুভ, মিনহাজ প্রামানিক, মাসিদুল সরদার সজিব ও সাগর আলী।

এ ছাড়া নিহত শাহীন নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। অন্য দুজন হলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার সাব্বির হোসেন ও মোহাম্মদ শামিম।

মরদেহ দেশে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিহতদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা ভিড় করতে শুরু করেন। প্রিয়জনের মরদেহ শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা স্বজনের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই।

নওগাঁ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, নিহতদের কয়েকটি পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাঁদের অনেকেই পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানো এবং ঋণের বোঝা কমানোর আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া মানুষগুলো আর জীবিত ফিরতে পারলেন না।

ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শাহীন

নিহত শাহীনকে ঘিরে তাঁর পরিবারের দুর্দশার চিত্র আরও হৃদয়বিদারক। পরিবারের সদস্যরা নওগাঁর পার-নওগাঁ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শাহীন। বিদেশে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তাঁর স্বজনেরা। বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করার যে স্বপ্ন নিয়ে শাহীন দেশ ছেড়েছিলেন, তা আর পূরণ হলো না। বরং তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ফেরা অন্য শ্রমিকদের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও অনেকটা একই রকম। পরিবারের অভাব দূর করতে এবং স্বজনদের ভালো রাখার আশায় তাঁরা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো শুধু প্রিয়জনকেই হারায়নি, হারিয়েছে জীবিকার অন্যতম অবলম্বনও।

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

রিয়াদের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু প্রবাসী কর্মীদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে কারখানার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হলে দ্রুত পরিচয় শনাক্ত, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি আরবের ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরায় তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। তবে প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এসব পরিবারের সামনে এখন জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন বাস্তবতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ তাঁদের এই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!