রাজধানীর বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে ক্রমেই বাড়ছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। শীতকালীন সবজির আগাম সরবরাহ শুরু হলেও অধিকাংশ সবজির দাম এখনো ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। সবজির পাশাপাশি মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমের বাজারেও স্বস্তি নেই। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতিদিনই আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে শীতকালীন সবজির কিছুটা আগাম সরবরাহ থাকলেও তার প্রভাব এখনো দামে পড়েনি। অধিকাংশ সবজিই বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক বেশি দামে। অন্যদিকে মাছ ও মাংসের দামও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম চড়া
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ফুলকপি, ঝিঙা, লাউ, কচুমুখী ও পটল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। বেগুন ও কাঁকরোলের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা। আগাম জাতের মুলা ও ঢ্যাঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। শিমের দাম আরও বেশি, প্রতি কেজি ১২০ টাকা।
এ ছাড়া আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি এবং টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। পেঁপের দাম তুলনামূলক কম, প্রতি কেজি ৩০ টাকা। মিষ্টিকুমড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি।
প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি আকারভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং লাউ ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচামরিচের দাম এখনো বেশ চড়া। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। বাজার ও পণ্যের মানভেদে এসব দামে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও দাম কমার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কিনতে গেলেই বাজেটের বড় একটি অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে সবজি কিনছেন।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও উচ্চমূল্যের চাপ রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে। রুই ও কাতলা মাছের দাম আকার ও মানভেদে ২৮০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি।
তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চিংড়ি। প্রতি কেজি চিংড়ি কিনতে ক্রেতাদের ব্যয় করতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা মাছ ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ট্যাংরা মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮০০ টাকা কেজি দরে।
বাজারে মাছ কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, পরিবারের জন্য মাছ কেনা এখন আগের তুলনায় ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় মাছের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
মুরগি ও মাংসের দামও নাগালের বাইরে
মাংসের বাজারেও দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। কক ও লেয়ার মুরগির দাম ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি। আর দেশি মুরগি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ৬৫০ টাকা।
গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৮২০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। ফলে নিয়মিত মাংস কেনা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে প্রয়োজন ও সামর্থ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
ডিমের দামেও বাড়তি চাপ
প্রোটিনের তুলনামূলক সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের বাজারেও স্বস্তি নেই। প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দরে। হাঁসের ডিমের দাম প্রতি ডজন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা।
ডিমের দাম বেশি থাকায় যেসব পরিবার মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডিমের ওপর নির্ভর করতে চায়, তাদেরও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। বাজার ও দোকানভেদে ডিমের দামেও কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে।
পাইকারি বাজারের দোহাই বিক্রেতাদের
বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, সবজির সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সব ধরনের পণ্যের দাম একসঙ্গে কমে না। মাছের ক্ষেত্রে প্রজাতি, আকার, মান ও সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে।
সবজি বিক্রেতা আসাদুল বলেন, ‘ক্রেতারা মনে করেন, বিক্রেতারা বেশি লাভের জন্য দাম বাড়ান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, আমাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। কিছু সবজির সরবরাহ বাড়লেও সব ধরনের সবজির দাম একসঙ্গে কমে না। আমরা চাই বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকুক, যাতে কম দামে কিনে ক্রেতাদেরও কম দামে দিতে পারি।’
আয় না বাড়লেও বাড়ছে সংসারের খরচ
বাজারের বাড়তি দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সে তুলনায় আয় বাড়ছে না। ফলে মাসিক বাজেট সামলাতে গিয়ে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। মাছ, মাংস ও সবজি—সবকিছু একসঙ্গে কেনার সামর্থ্য অনেক পরিবারের থাকছে না।
রায়সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা বাধন হাসান বলেন, ‘আমরা তো বিলাসিতার জন্য বাজার করি না, পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার জন্য করি। কিন্তু বাজারে এসে প্রতিদিনই হিসাব মেলাতে হচ্ছে। মাছ কিনতে গেলে সবজি কম নিতে হয়, মাংস কিনতে গেলে অন্য কিছু বাদ দিতে হয়। আয় তো আর বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিন খরচ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের কষ্টটা দেখার যেন কেউ নেই।’
সামগ্রিকভাবে রাজধানীর বাজারচিত্র বলছে, শীতকালীন সবজির আগাম সরবরাহ শুরু হলেও নিত্যপণ্যের দামে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমের উচ্চমূল্যও ক্রেতাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

