জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বাড়তি চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনে ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জ্বালানি খরচ। ফলে আগের তুলনায় বেশি দামে পণ্য কিনে ঢাকায় আনতে হচ্ছে তাদের। পরিবহন ও সরবরাহের অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়ে বাজারে পণ্যের দামও বাড়াতে হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব সবজির বাজারে
রাজধানীর খিলক্ষেত খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সবজির সরবরাহ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গসহ দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ঢাকায় সবজি আনতে পরিবহন খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিক্রেতারা বলছেন, উৎপাদন এলাকা থেকে পণ্য সংগ্রহের পর তা ট্রাক বা পিকআপে করে ঢাকায় আনতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন মালিকদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। সেই বাড়তি ব্যয় প্রথমে পাইকারি পর্যায়ে এবং পরে খুচরা বাজারে যুক্ত হচ্ছে।
ফলে একই পণ্য আগের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
মাছ পরিবহনেও বেড়েছে খরচ
খিলক্ষেত বাজারে টাঙ্গাইল থেকে মাছ নিয়ে আসা এক পিকআপচালক জানান, টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসতে তার প্রায় ২০ থেকে ২৫ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার পর একই দূরত্বে পণ্য পরিবহনে আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে।
তার ভাষ্য, জ্বালানির বাড়তি খরচ সরাসরি পরিবহন মালিকদের বহন করতে হচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বাড়ছে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মাছের বিক্রয়মূল্যের ওপর পড়ে।
ব্যবসায়ীদের মতে, মাছ ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল পণ্য দীর্ঘ দূরত্ব থেকে আনার ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে তা দ্রুত বাজারদরে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয়
বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উৎপাদক বা স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহের পর তা আড়ত, পাইকারি বাজার এবং সর্বশেষ খুচরা পর্যায়ে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপেই পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় রয়েছে।
জ্বালানির মূল্য বাড়লে শুধু ঢাকা পর্যন্ত পণ্য আনার খরচই বাড়ে না, স্থানীয়ভাবে পণ্য পরিবহন, আড়ত থেকে বাজারে নেওয়া এবং খুচরা বিক্রেতার দোকান পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা সাধারণত এসব বাড়তি ব্যয় পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করেন।
ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার শুরুতে যে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়, তা ধাপে ধাপে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ক্রেতাদের বাড়ছে ভোগান্তি
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় বাজারে এসে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। আয় একই থাকলেও বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, একটি পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে কতটা দাম বাড়ানো যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব বাস্তবে পণ্যের দামে কতটা পড়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
বাজার তদারকি জোরদারের দাবি
ভোক্তারা বলছেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে যদি পণ্যের প্রকৃত খরচ বাড়ে, তাহলে তার যৌক্তিক প্রভাব বাজারদরে পড়তেই পারে। তবে সেই সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা বা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
বিশেষ করে সবজি, মাছ, মুরগি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাইকারি ও খুচরা দামের পার্থক্য এবং পণ্য পরিবহনের প্রকৃত ব্যয় যাচাই করে বাজার তদারকি করার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ব্যয় বাড়ার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। আর সেই চাপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন ভাড়া এবং পণ্যের বাজারদরের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে কার্যকর নজরদারি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

