বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম বাদী হয়ে রাজধানীর উত্তরখান থানায় মামলা করেছেন। এ ঘটনায় তাহসিফের ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে তাঁকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাঁকে আদালতে তোলার কথা রয়েছে।
শনিবার পিবিআই সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, শনিবার মধ্যরাতে দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে আগ্রহ না থাকায় এ ঘটনায় নৌ পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করবে বলে জানানো হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার আগে ছয় ঘণ্টা একসঙ্গে ছিলেন তাহসিফ-দীপ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার শাহরিয়ার রেজা দীপ। এ কারণে ঘটনার সময় তাঁদের অবস্থান, চলাফেরা এবং তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় কী ঘটেছিল, তা জানতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে তাঁকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল উদ্ধার
গত শুক্রবার পিবিআইয়ের একটি তদন্ত দল দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যায়। তুরাগ নদসংলগ্ন ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আশপাশে কী ঘটেছিল, তা জানতে তাঁকে সেখানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না। মোটরসাইকেলটি কীভাবে সেখানে গেল এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
দীপের বক্তব্যে পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তির কথা
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ ঘটনার রাতের বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে দুজনের কথা বলার সময় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করেন। ধাওয়াকারীদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
দীপের দাবি, ওই ব্যক্তিদের দেখে তাহসিফ দৌড় দেন। একপর্যায়ে তিনি তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। পরে তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধাওয়াকারীরা কারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সত্যিই পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না এবং তাহসিফ কী পরিস্থিতিতে নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে দীপের দীর্ঘ সময় অবস্থান, তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় তাঁদের যাওয়া, সেখানে ধাওয়ার ঘটনা এবং নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া দীপের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের উপস্থিতির বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তদন্তের স্বার্থে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আদালতে দীপের উপস্থাপন এবং পরবর্তী তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাবেক এই বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

