একসময় নিরিবিলি ও শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিতি যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। চরমপন্থীদের তৎপরতা ও এরশাদ শিকদারের অপরাধজগতের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে একপর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও নগরীতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। খুন, গুলি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক কারবার এবং প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় একাধিক সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নগরী ও আশপাশে অন্তত নয়টি অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কোনো কোনো গোষ্ঠীতে ৩০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে। সদস্যদের বড় অংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। পাড়া-মহল্লাভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে এসব গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে শুধু অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো নয়, নগরীর সাধারণ বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন পেশার মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
খুলনায় আলোচনায় থাকা ৯ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় যেসব অপরাধী গোষ্ঠীর নাম বারবার আলোচনায় আসছে, সেগুলো হলো—
১. বি-কোম্পানি: রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’র নেতৃত্বাধীন বলে পরিচিত। খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
২. পলাশ গ্রুপ: শেখ পলাশের নেতৃত্বে পরিচালিত বলে পরিচিত। দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
৩. হুমা বাহিনী: হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায় তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
৪. আশিক বাহিনী: খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায় সক্রিয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু হত্যা ও গুলির ঘটনায় এ গোষ্ঠীর নাম এসেছে।
৫. নূর আজিম গ্রুপ: খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
৬. টেনকি শাওন গ্রুপ: সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর এলাকায় চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
৭. আরমান গ্রুপ: আরমান শেখের নেতৃত্বাধীন বলে পরিচিত। দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
৮. শাকিল গ্রুপ: শাকিল শেখের নেতৃত্বে স্থানীয় অপরাধ ও সংঘাতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
৯. নাসিম গ্রুপ: নাসিমুল গণীর নেতৃত্বে পরিচালিত হতো বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি নিহত হওয়ার পর গোষ্ঠীটির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব গোষ্ঠীর বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা ও নেতৃত্ব সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ হালনাগাদ তালিকা প্রকাশিত হয়নি। ফলে তালিকায় থাকা নামগুলোকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য ও অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে আলোচনায় বি-কোম্পানি, পাড়া-মহল্লায় এজেন্ট থাকার অভিযোগ
খুলনার অপরাধজগতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বলে পরিচিত ‘বি-কোম্পানি’। পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাড়া-মহল্লাভিত্তিক লোকজন ও এজেন্টের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি তৎপরতা চালায়।
অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রচার, প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। সমাজসেবামূলক কাজের প্রচারের আড়ালেও অপরাধমূলক তৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের কয়েকটি সূত্রের দাবি, ‘নবাব’ নামে পরিচিত একটি পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি নিজেদের বি-কোম্পানি বা নবাবের লোক পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের কাছে অর্থ দাবি করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করে অর্থ দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না হলে ভয়ভীতি, নজরদারি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ পরিস্থিতি এড়াতে গোপনে অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন।
বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর দুই বা তার বেশি তলাবিশিষ্ট বাড়ির মালিকদের লক্ষ্য করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি এলাকায় এ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নিয়মিত ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়। কখনো এলাকায় লোকজনের উপস্থিতি বাড়িয়ে ভয় দেখানো হয়, আবার কখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চলাচলের ওপর নজরদারির কথা জানিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
কেউ কেউ চাঁদার অর্থ নিয়ে সমঝোতা করলে তাঁদের বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট পাঠানোর কথাও স্থানীয়দের কয়েকজন জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট মামলা, তদন্তের ফলাফল কিংবা আদালতে প্রমাণিত তথ্য পাওয়া না গেলে এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
অন্যান্য গোষ্ঠীর তৎপরতা ও এলাকায় এলাকায় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব
বি-কোম্পানির বাইরে পলাশ, নূর আজিম, আশিক, হুমা, টেনকি শাওন, আরমান, শাকিল ও নাসিম গ্রুপের নামও বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নূর আজিম ও আশিক গ্রুপের প্রভাব খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায়। শাওন গ্রুপের তৎপরতার কথা বলা হচ্ছে সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে। অন্যদিকে আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনীর বিরুদ্ধে দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকায় সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
জেলা পুলিশের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, রূপসা, তেরখাদা, বটিয়াঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবার, নদীর ঘাট দখল, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ এবং চিংড়ির ঘের ও জমি দখল নিয়ে বিরোধে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পলাশের উত্থান, গ্রেপ্তারের পর গ্রুপে ভাঙনের অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, শেখ পলাশ একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তাঁর প্রভাব বাড়তে শুরু করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য। পরে নিজস্ব লোকবল তৈরি করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০১৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন কারাগারে ছিলেন তিনি। পরে জামিনে মুক্ত হন। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় পলাশের অনুসারীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে।
এ সময় অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রেনেড বাবুর গোষ্ঠীর সঙ্গে পলাশ গ্রুপের বিরোধ তৈরি হয় বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। দুই পক্ষের বিরোধের জেরে একাধিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ যৌথ বাহিনী সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে শেখ পলাশকে তাঁর ১০ সহযোগী ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। সূত্রগুলোর দাবি, তাঁর গ্রুপের অনেক সদস্য পরে নূর আজিম ও আশিক গ্রুপে যুক্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মারধরসহ অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের সূত্র জানিয়েছে। নূর আজিম ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আটক হন এবং ওই বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে জামিনে মুক্তির পর আবারও সক্রিয় হন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
মাদক কারবার ও অস্ত্রের জোগান ঘিরে সংঘাত
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনার অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ মাদক ব্যবসা। মাদক বিক্রির এলাকা নিয়ন্ত্রণ, অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা এবং দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অপরাধী গোষ্ঠী মাদক সরবরাহ ও বিক্রির জন্য স্থানীয় তরুণদের ব্যবহার করে। তাদের মোটরসাইকেল, মাসিক বেতন কিংবা কমিশনের ভিত্তিতে কাজে যুক্ত করা হয়। মাদক বিক্রির অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা হুমকি, হামলা এবং কখনো হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, খুলনায় এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, নগরীতে অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে। তবে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পুলিশের কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো অস্ত্রের জোগান ও স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগী নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এ কারণে মাদকবিরোধী অভিযান এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম একসঙ্গে জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে একাধিক গোষ্ঠীর নাম
খুলনায় সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যা ও গুলির ঘটনায় বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর নাম এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ২২ অক্টোবর গুলিতে নিহত তাওহিদুল পলাশ গ্রুপের সদস্য ছিলেন। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর গোষ্ঠীর সঙ্গে বি-কোম্পানির বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এজাহারে বি-কোম্পানির সদস্য হিসেবে পরিচিত শহিদুল ইসলাম ওরফে সেজান, সাকিবুর রহমান ওরফে জিতু এবং রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, খুশি আক্তার হত্যার ঘটনায় তাঁর বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত আশিকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। এসব মামলার অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
দেড় বছরে ৯১ হত্যাকাণ্ড, বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা
খুলনা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী দেড় বছরে মহানগরী ও জেলায় ৯১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া গত ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকাণ্ডের তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাতে চলাচল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বাসিন্দারা।
মিস্ত্রিপাড়ার রিকশাচালক ইসমাইল হোসেনের অভিজ্ঞতা সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তিনি জানান, কয়েক দিন আগে রাত ১টার দিকে নিরালার মোড়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। সেদিনের উপার্জনের সব টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাঁর কাছ থেকে। ৩৬ বছর ধরে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনার মুখোমুখি আগে হননি বলেও জানান তিনি।
‘শান্তির শহর খুলনার মানুষ এখন শান্তিতে নেই’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত খুলনার মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, অপরাধীরা প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিলেও মূল হোতা ও নেপথ্যের কারবারিরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, অপরাধী গোষ্ঠীর অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং পেছনের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে না পারায় নগরীতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একের পর এক গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পুলিশের দাবি, অভিযান ও ব্লক রেইড জোরদার
খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। পুলিশ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। তবে জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করায় তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমে সমস্যাও তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং ব্লক রেইড জোরদার করা হয়েছে। গুলির ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে রূপসায় ১১টি, তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় চারটি এবং বটিয়াঘাটায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, অভিযান জোরদার করায় নিয়মিত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে অপরাধীদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তথ্য না দেওয়ায় তাদের শনাক্ত করতে অনেক সময় সমস্যা হয়। পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতায় নিরাপদ খুলনা গড়ে তোলা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমদে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে এবং সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে বলে তাঁদের ধারণা। অস্ত্র কারবারিদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকে অপরাধ পরিচালনার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের নেটওয়ার্কও ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন মূল হোতা ও অর্থের উৎস শনাক্ত
খুলনায় সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধী গোষ্ঠীর অর্থের উৎস, মাদক সরবরাহের পথ, অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা এবং নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা জরুরি।
একই সঙ্গে জামিনে মুক্তির পর অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে আইনগত নজরদারি, মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। কিশোর ও তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে খুলনার মানুষের প্রত্যাশা—অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধী গোষ্ঠীর শিকড় উপড়ে ফেলার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একসময় যে শহর শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে আবারও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও নাগরিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

