কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মেরিনড্রাইভ সড়কের দুই পাশে গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য পর্যটননির্ভর বাণিজ্যিক স্থাপনা। কিন্তু পর্যটনশিল্পের এই সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিশ্চিত হয়নি পরিকল্পিত উন্নয়ন, নির্মাণ অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, মেরিনড্রাইভ এলাকায় প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ এলাকায় তারকামানের মাত্র ২০ থেকে ২৫টি স্থাপনার নকশা অনুমোদন পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীতে মেরিনড্রাইভের পাশে অবস্থিত টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনার পর জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। রিসোর্টটির নকশায় কউকের অনুমোদন ছিল না। ফায়ার সার্ভিস গত জুনে নোটিশ দিলেও তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব যেসব সংস্থার, তাদের নজরদারির মধ্যেই কীভাবে একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠল? এখন প্রশাসন অভিযান চালানোর প্রস্তুতির কথা জানালেও দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হবে, তা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ।
মেরিনড্রাইভে প্রায় ২৫০ অনুমোদনহীন রিসোর্ট
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মেরিনড্রাইভ এলাকায় প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অথচ কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কসংলগ্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে আবাসন, খাবার ও বিনোদনকেন্দ্রিক ব্যবসা।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মেরিনড্রাইভের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, পাহাড় ও ঝাউবন পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও বাইরের উদ্যোক্তারা হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, নির্মাণবিধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এসব স্থাপনা গড়ে উঠলে তা পর্যটনশিল্পের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উখিয়ার ইনানী অংশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় পর্যটকদের বাণিজ্যিক সেবা দেওয়া অন্তত ২৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বে ওয়াচ, সাগরলতা রিসোর্ট, বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা, দ্য ওয়েভ রিসোর্টস লিমিটেড, হোটেল ইনানী লং বে, ইনানী রয়্যাল রিসোর্ট, ইনানী বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ডেরা রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, সেইলর বিচ রিট্রিট, টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট, পেবল স্টোন রিসোর্ট, অ্যান্ড্রোমিডা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, ভিলা পাংকৌড়ি, রোয়াং ভেদা কোস্টাল রেসিডেন্স, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, লা বেলা রিসোর্ট, অ্যাঙ্কর ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ওশান নিয়ন রিসোর্ট, রয়্যাল টিউলিপ সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বেলাভূমি বিচ ভিলা, আভা বিচ রিসোর্ট, বিচ প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সি আইল্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং নিউ ভিশন ইনানী।
প্রাপ্ত তথ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১৪টি নিজেদের ইকো বা পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিবেশবান্ধব দাবি করলেই সেটি পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি স্থাপনার অনুমোদন ও বাস্তব অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রেস্তোরাঁ থেকে রিসোর্ট, দ্রুত বদলে গেছে পর্যটন এলাকার চিত্র
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেরিনড্রাইভের উখিয়া অংশে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল মূলত রেস্তোরাঁকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। সময়ের সঙ্গে এসব ব্যবসার পরিসর বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁর সঙ্গে আবাসনসেবা যুক্ত হয়েছে, আবার কোথাও নতুন করে রিসোর্ট ও হোটেল গড়ে উঠেছে।
২০০৯ সালে পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘কোরাল স্টেশন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ ছোট পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। পরে ওই এলাকায় সি মাউন্ট, ওশান কিচেনসহ আরও কয়েকটি রেস্তোরাঁ চালু হয়।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক হোটেল ব্র্যান্ড রয়্যাল টিউলিপের মাধ্যমে সি পার্ল হোটেল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের প্রবণতা বাড়তে শুরু করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
টুপটুপ রিসোর্টের জায়গায় ২০২৩ সালে প্রথমে রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু হয়। পরে মালিক তানভীর মিয়া ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে রিসোর্টে রূপান্তর করেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে স্যালমন রেস্তোরাঁর পেছনে বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা এবং ওশান কিচেনের পাশে অ্যাঙ্কর রিসোর্ট গড়ে ওঠে। এভাবে প্রায় ৯ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান রেস্তোরাঁ থেকে আবাসিক পর্যটনসেবায় সম্প্রসারিত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল আমিন বলেন, প্রায় এক দশক আগে এ এলাকায় রেস্তোরাঁর সংখ্যাই বেশি ছিল। এখন সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিসর বেড়েছে। পুরোনো রেস্তোরাঁগুলোর অনেকগুলোই হোটেল ও রিসোর্টে পরিণত হয়েছে।
পর্যটকদের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কারণে এ ধরনের সম্প্রসারণ ঘটলেও প্রতিটি স্থাপনার ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে আবাসিক সেবা চালু হলে অগ্নিকাণ্ড, জরুরি বহির্গমন, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে সামনে এসেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন
গত ১৭ অক্টোবর ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা মেরিনড্রাইভ এলাকার পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির নকশা কউকের অনুমোদন পায়নি। প্রতিষ্ঠানটি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
একটি ট্রেড লাইসেন্স সাধারণত ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি-সংক্রান্ত নথি। কিন্তু শুধু ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই কোনো হোটেল বা রিসোর্টের নির্মাণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি, অবস্থান ও কার্যক্রম অনুযায়ী প্রযোজ্য সব অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের পর এ প্রশ্নও সামনে এসেছে—পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তবে অগ্নিকাণ্ডের নির্দিষ্ট কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল ও সরকারি নথি গুরুত্বপূর্ণ।
সৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপনা, পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
মেরিনড্রাইভের উখিয়া অংশে শুধু সড়কের পাশে নয়, সৈকতের বালিয়াড়ি ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার কাছেও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনা সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, বালিয়াড়ি এবং উপকূলীয় প্রতিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোনারপাড়া রিসোর্টের সামনে সড়কের বিপরীত পাশে সৈকত এলাকায় ‘ঝাউবাগান বিচ রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, বালিয়াড়ি ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবস্থিত এই স্থাপনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
উখিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রেস্টুরেন্টটির পরিচালক মনির বলেন, কাগজপত্র থাকায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁদের উচ্ছেদ করেননি। তাঁরা ফায়ার সার্ভিস ও কউকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন এবং অনুমোদন পাওয়ার আশা করছেন।
একই এলাকার সৈকতের বালিয়াড়িতে ‘সাদাবালি’ নামে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি আরেকটি রিসোর্ট পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে কর্মরত একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী রিসোর্টটি তৈরি করেছেন এবং তাঁরা অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা, ভূমির শ্রেণি, পরিবেশগত অবস্থান এবং অনুমোদনের নথি যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সৈকত বা বালিয়াড়িতে নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৈকতে কিটকট চেয়ার বসিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম
সৈকত এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি কিটকট চেয়ার বসিয়ে পর্যটকদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করার প্রবণতাও দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে পালংকি, পেবল স্টোন, বে ওয়াচ ও সি পার্লসহ ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের এমন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সৈকত সবার জন্য উন্মুক্ত প্রাকৃতিক ও পর্যটনসম্পদ। সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান কী শর্তে চেয়ার বসাতে পারবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করতে পারবে এবং কী ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট বিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটলে সাধারণ পর্যটকদের চলাচল, সৈকতের উন্মুক্ত ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে সৈকতের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ নিয়মনীতি এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অধিকাংশ রিসোর্টের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই বলে তাঁর দাবি।
তিনি বলেন, সৈকত দখল করে নির্মাণসহ আইনবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনা এবং নিয়মনীতি না মানার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তাঁর বক্তব্য থেকে পর্যটন ব্যবসার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। তবে জেলার কতটি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের কী কী অনুমোদন রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা জরুরি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে জরিমানা, মামলা
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন জানান, গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, পর্যটন স্থাপনা ও পরিবেশগত বিধিবিধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার নজির রয়েছে। তবে জরিমানা ও মামলা দায়েরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তী সময়ে নিয়ম মেনেছে কি না, অবৈধ স্থাপনা সরানো হয়েছে কি না এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত নজরদারি, অনুমোদন যাচাই, আইন প্রয়োগ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে প্রশাসন
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কউক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটন স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হোটেলগুলোর মালিকদের বৈধতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দীন জানান, অনুমোদনহীন হোটেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে সময়মতো অভিযান চালানো সম্ভব না হলেও তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থাপনাগুলোর অনুমোদন, নির্মাণবিধি, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে কার্যকর ফল পেতে অভিযান নিয়মিত চালানো, অনিয়মের ধরন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
পরিবেশ ও পর্যটন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের জন্য সমুদ্রসৈকত, বালিয়াড়ি, ঝাউবন ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি। অপরিকল্পিত স্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি পর্যটকদের জন্য ঝুঁকি তৈরির পাশাপাশি পর্যটন এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। সৈকত বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে। পরিবেশ ও পর্যটন—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হলে বিনিয়োগকারীরা এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, অনুমোদনপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং নিয়ম না মেনে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি পরিবেশগত বিধিনিষেধ, অগ্নিনিরাপত্তা ও নির্মাণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার আগে স্থাপনার অবস্থান, কাঠামোগত নিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন এখন নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে
কক্সবাজারের মেরিনড্রাইভ এলাকায় পর্যটন ব্যবসার প্রসার স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পর্যটনসেবার জন্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু অনুমোদনহীন স্থাপনা, সৈকত ব্যবহারে অনিয়ম এবং অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির অভিযোগ এ সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর প্রশাসনের অভিযান ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘোষণা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই, পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
মেরিনড্রাইভের পর্যটনশিল্পকে টেকসই করতে শুধু নতুন হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ বা পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তা, স্থানীয় মানুষের অধিকার এবং কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

