ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

menu

জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান। আলোচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন শিল্প, সার উৎপাদন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে মাসুমি কাকিনোকির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিময়, শিল্পায়ন এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশই পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে পারে।

আলোচনায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প স্থাপন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাস্তবায়নে আশাবাদ

মাসুমি কাকিনোকি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করা, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য জাপান একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। জাপানি প্রযুক্তি, শিল্প ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজার, শ্রমশক্তি ও শিল্পায়নের সম্ভাবনা জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদন শিল্পসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসব খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার বিকাশে সহায়তা করতে পারে।

উন্নত উৎপাদন শিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কাফকো আধুনিকায়ন ও দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব

আলোচনায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সার উৎপাদন খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নতুন সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হলে দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহের সক্ষমতা, শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনাও বিবেচনায় আসতে পারে।

তবে নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ব্যয়, জ্বালানির প্রাপ্যতা, উৎপাদন প্রযুক্তি, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে জাপানের প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্ভাব্য প্রকল্পের মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সংস্কার ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাস

বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সংস্কার, বিনিয়োগের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ চলছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ অনুমোদনপ্রক্রিয়া, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার বাস্তবায়িত হলে নতুন প্রকল্প গ্রহণ, শিল্প স্থাপন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে যৌথ প্রকল্প গ্রহণের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এর ফলে সরকারি সম্পদের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকেরা

সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও পররাষ্ট্রনীতিসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

এর আগে মারুবেনির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

এর আগে গত ১১ অক্টোবর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পরপর এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে আলোচনার ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগ চুক্তি, প্রকল্পের অর্থায়ন বা বাস্তবায়নসূচি চূড়ান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া গেলে সহযোগিতার অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।

নতুন বিনিয়োগে সম্ভাবনা, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন শিল্প ও সার খাতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মাসুমি কাকিনোকির এ সাক্ষাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে দুই পক্ষের আগ্রহ উঠে এসেছে। এখন এসব আলোচনা কতটা বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন প্রকল্প এবং কার্যকর বাণিজ্যিক সহযোগিতায় রূপ নেয়, তার ওপরই ভবিষ্যৎ অগ্রগতি নির্ভর করবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!