প্রধানমন্ত্রীর সফরে প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং উপজেলা প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার পারস্পরিক বিরোধ—একাধিক ঘটনা ঘিরে দেশের মাঠ প্রশাসনের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি, ঘুষ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফাইল আটকে রাখা এবং দলীয় প্রভাবের অভিযোগ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতারা।
সম্প্রতি রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদারের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউএনও শিল্পী রাণী মোদক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তর বিরোধের ঘটনা আলোচনায় আসে। এসব ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি, দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলছেন, প্রশাসন নিয়ে বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক বক্তব্যের অনেকগুলোরই সত্যতা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনকে মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু কর্মকর্তাদের দায়ী করলেই হবে না; নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকারও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, প্রশাসনের পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে যোগ্যতা, সততা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নির্বাচন এবং দায়িত্ব বণ্টন জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগ
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার অন্যতম ঘটনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরকে কেন্দ্র করে। গত ২০ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
সফর শেষে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দনের পর বিভাগীয় কমিশনারকে তাঁকে জড়িয়ে ধরার মতো ভঙ্গি করতে দেখা যায়—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর তাঁর আচরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগ ওঠে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিষ্টাচার, প্রটোকল ও আচরণবিধি অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আচরণ অনেক সময় পুরো প্রশাসনের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট আচরণ বিধিবহির্ভূত ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধি ও ঘটনার প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিভাগীয় কমিশনারকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার ঘটনা প্রশাসনিক মহলে আলোচনার জন্ম দিলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট হবে।
ইউএনওর রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
এর কয়েক দিনের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদারের একটি বক্তব্য ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়।
সম্প্রতি একটি দুর্গামন্দিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের বক্তব্যের সময় ইউএনওকে হাততালি দিতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চান। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে ইউএনওর একটি বক্তব্যও আলোচনায় আসে। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি এখন বিএনপির নেতা’।
একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন বক্তব্য এবং রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থনসূচক আচরণের বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ নীতি। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব ও আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, বক্তব্যের ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিত।
জামালগঞ্জে ইউএনও-এসিল্যান্ড বিরোধ, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় ইউএনও শিল্পী রাণী মোদক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তর বিরোধের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
গত ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে আরিফুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কয়েকটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ইউএনওকে নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন এবং প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগের কথা লেখেন। পরে পোস্টগুলো মুছে ফেলা হয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএনওর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে অসুস্থ হয়ে পড়া সহকারী কমিশনারকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়।
একই উপজেলা প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার মধ্যে এমন বিরোধ প্রকাশ্যে আসায় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, কর্মপরিবেশ ও দাপ্তরিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে বিরোধের প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়।
মাঠ প্রশাসনে ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ভূমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিক সেবা দেওয়ার মতো কাজে তাঁদের পারস্পরিক সমন্বয় প্রয়োজন। এ ধরনের বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে দাপ্তরিক কার্যক্রম ও জনসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনিকভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
দুর্নীতি ও ঘুষ নিয়ে স্পিকারের কঠোর সমালোচনা
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বিতর্কের বাইরেও সরকারি প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোলায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের...অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুষখোরি, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।’
তাঁর বক্তব্যে সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও ঘুষের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি উঠে আসে। তবে এ ধরনের সামগ্রিক অভিযোগের সত্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা, তদন্তের ফলাফল এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। সব সরকারি কর্মকর্তাকে একইভাবে মূল্যায়ন করার পরিবর্তে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সেবা পেতে ঘুষ, অযথা বিলম্ব কিংবা অনানুষ্ঠানিক তদবিরের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
‘আগের অনিয়মের সংস্কৃতি এখনো রয়ে গেছে’
গত ৩০ জুলাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রশাসনের পুরোনো অনিয়ম ও কাজ আটকে রাখার সংস্কৃতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তথ্য ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগে যারা ঘুষ খেতেন, তাঁরা এখনো ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছেন। একইভাবে আগে যারা ভালো কাজ আটকে দিতেন, তাঁরা এখনো তা আটকে দিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকে নিজেদের অবস্থান ও পরিচয় পরিবর্তন করলেও তাঁদের কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ‘এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এজন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে।’
তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনিক সংস্কার ও জনসেবার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দপ্তরে কাজের গতি বাড়ানো, অনিয়ম বন্ধ করা এবং নাগরিক সেবা সহজ করার ক্ষেত্রে পুরোনো পদ্ধতির পরিবর্তন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে এ বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ
গত ৭ অক্টোবর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ভবনে পাঁচ দিনব্যাপী ‘শারদ মেলা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতির সমালোচনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সেবায় কাজ করতে হবে।
সরকারি দপ্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চাপ এবং ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো অনুমোদন বা সেবা পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়ে এবং নাগরিকদের ভোগান্তিও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যা কমাতে সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা অযৌক্তিকভাবে ফাইল আটকে রাখলে তার কারণ ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও কার্যকর হওয়া দরকার।
প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধে সংসদ সদস্যদের ক্ষোভ
গত ১১ অক্টোবর রংপুর জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল।
জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন যদি সংসদ সদস্যদের মূল্যায়ন না করে, তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। আমাকে বাধ্য করবেন না থানা ঘেরাওয়ের জন্য, আমাকে বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের জন্য। পরিষ্কার বললাম। আমি ভদ্র লোক, কিন্তু অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না।’
তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘উই আর দ্য সন অব দিস সয়েল, অব দিস ল্যান্ড। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। আপনারা পাত্তা দিচ্ছেন না কেন? চেয়ার দিতে চান না কেন? জনগণ নিয়ে কি ঘেরাও করব? রাস্তাঘাট চলাচল বন্ধ করে দেব?’
এ বক্তব্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় এবং যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের সীমারেখা আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। জনস্বার্থে সহযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনের পেশাদার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাও বজায় রাখা জরুরি।
দলীয়করণের অভিযোগ ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
গত ১০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক স্মরণসভায় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অনৈতিকতার প্রভাব এখনো রয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অনৈতিকতার বৈশিষ্ট্য এখনো প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিতর্কিত বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
রিজভীর অভিযোগ, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে থাকা কিছু ব্যক্তি সরকারের জনবান্ধব কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
তবে প্রশাসনে দলীয়করণ বা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু অতীতে দায়িত্ব পালন বা নিয়োগ পাওয়ার ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তাকে দলীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হলে পেশাদার কর্মকর্তারাও অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আবার প্রমাণিত অনিয়ম বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উপেক্ষা করলেও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, প্রশাসন নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্যের অনেকগুলোরই সত্যতা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। কোথাও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনকে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। তাঁর দাবি, প্রশাসন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সচল রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন নিয়ে অস্বস্তির প্রশ্নই নেই। প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের কাজ নিয়ে অপপ্রচার চালানো হতে পারে।’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে অভিযোগ যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রম বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বিতর্কিত ঘটনা ও অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত এবং গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে আস্থা বাড়তে পারে।
‘সরকারি কর্মচারীদের এই দেশে নষ্ট করেছে রাজনীতিবিদরা’
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান অবস্থার জন্য শুধু প্রশাসনকে দায়ী করলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ও প্রশাসনিক নিয়োগ-পদায়নের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘স্পিকারের বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করি না। কারণ, এই সরকারি কর্মচারীদের এই দেশে নষ্ট করেছে রাজনীতিবিদরা। সব সরকারের আমলেই দুর্নীতিবাজেরা দরকষাকষি করে, তদবির করে। আর রাজনীতিবিদেরা তাদের কাছে গলে যান।’
তাঁর মতে, জনগণ ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায় পাঠায় দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা এবং জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে তার দায়ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিতে হবে।
আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘আপনি যদি ভালো লোক বের করতেই না পারেন, তাহলে ক্ষমতায় থাকেন কেন? এখনো বহু অসৎ লোক আছে, বহু সৎ লোকও আছে। তাদের খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব।’
প্রশাসনে আগের সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অবস্থান এবং তাঁদের একটি অংশের দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশাসনে দলীয়করণ হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আগের সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা সব কর্মকর্তাই দলীয় ছিলেন—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
তিনি বলেন, ‘সেখানে কিছু পেশাদার কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে কারা পেশাদার, আর কারা একেবারে দলবাজি করেছেন। যারা পেশাদার, তাদের কাজে লাগাতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দিতে হবে। যারা স্পষ্টভাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের আলাদা করতে হবে।’
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের প্রশাসন নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জনগণ ভোট দিয়ে আপনাদের ক্ষমতায় এনেছে। এখন আপনি অভিভাবক। আপনি আমাদের ভালোভাবে চালাবেন। আপনি যদি কেবল কান্নাকাটি করেন, তাহলে তো আপনার অযোগ্যতা প্রমাণিত হয়।’
গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে যোগ্যতা ও সততা যাচাইয়ের তাগিদ
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ে ঘাটতি রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে সাবেক এই সচিব বলেন, কাজটি কঠিন হলেও সরকারকে দৃঢ় হতে হবে। তদবির ও বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণে যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইয়ে সমস্যা হতে পারে। তবে এসব চাপ উপেক্ষা করে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি ব্যাচে ৫০০ কর্মকর্তা থাকলে তাঁদের মধ্যে যোগ্যতার বিচারে অনেক পেছনে থাকা কাউকে তদবিরের মাধ্যমে ঢাকার জেলা প্রশাসক বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইভাবে যোগ্যতার তালিকায় প্রথম, পঞ্চম বা দশম স্থানে থাকা কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি বা দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলে শুধু আগের সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকে বাদ দেওয়াও ঠিক হবে না।
তাঁর মতে, কর্মকর্তাদের অতীত কর্মদক্ষতা, সততা, পেশাদারত্ব ও দায়িত্ব পালনের রেকর্ড বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
প্রশাসনের আস্থা ফেরাতে কী প্রয়োজন
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আচরণবিধি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়াও সমস্যার সমাধান নয়।
প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরে ঘুষ, ফাইল আটকে রাখা ও অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দাপ্তরিক সমন্বয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বের সীমারেখা বজায় রাখার বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে, প্রশাসনের পেশাদারত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের নয়; রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে সহযোগিতা বজায় রেখে আইন ও বিধির সীমারেখা অনুসরণ করা গেলে জনসেবা আরও কার্যকর হতে পারে।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নির্বাচন—এই তিনটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা পুনর্গঠনের পথ আরও সুগম হতে পারে।

