নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে ফারজানার পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলামকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নাজমুল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ভুইঘর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
আর্থিক বিরোধ ও নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের
ফারজানার বড় ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে ভালোবেসে নাজমুল ইসলামকে বিয়ে করেন তাঁর বোন। বিয়ের সময় নাজমুল বেকার থাকায় প্রায় এক বছর ধরে ফারজানার পরিবার তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। পরে নাজমুলের চাকরি হলে পরিবারের পক্ষ থেকে সেই সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আরিফুল ইসলামের দাবি, এরপরও বিভিন্ন সময়ে টাকার জন্য ফারজানার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন নাজমুল। এমনকি তাঁকে মারধর করার অভিযোগও করেন তিনি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বামীর বাসা ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান ফারজানা। সেখানে প্রায় চার মাস অবস্থান করলেও নাজমুল তাঁর কোনো খোঁজ নেননি বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
আরিফুল ইসলাম জানান, পরবর্তী সময়ে পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে ফারজানাকে নিজের বাসায় নিয়ে যান নাজমুল। এ সমঝোতার পর মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয় পরিবার।
মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে ফোন, কয়েক ঘণ্টা পর মৃত্যুর খবর
ফারজানার ভাইয়ের দাবি, শনিবার নাজমুলের দুলাভাই তাঁকে ফোন করে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, তা জানতে চান। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১০টার দিকে নাজমুল ফোন করে ফারজানার আত্মহত্যার খবর দেন।
ঘটনার সময়ক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে আরিফুল ইসলাম বলেন, তাঁর বোনের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে পরিবারের এ অভিযোগের পক্ষে কোনো তদন্ত-নিষ্পত্তির তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ফারজানার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর ভাই। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ থাকলে তাঁদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাড়ির মালিকের বক্তব্য
বাড়ির মালিক আব্দুল কাদের জানান, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাজমুল তাঁকে ডেকে স্ত্রীর আত্মহত্যার কথা জানান। পরে তিনি সেখানে গিয়ে ফারজানাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
আব্দুল কাদের আরও বলেন, এর আগে তিনি আরেকটি আত্মহত্যার ঘটনায় মরদেহ নামানোর অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। তবে ফারজানার মরদেহ দেখে তাঁর কাছে আগের ঘটনার সঙ্গে কিছু পার্থক্য মনে হয়েছে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে মৃত্যুর কারণ
ঘটনার বিষয়ে ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারজানাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটি আত্মহত্যা হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন এসআই গাজী সুমন মাহতাব।
ফারজানার মৃত্যু ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, বাড়ির মালিকের পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

