সড়কে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। কোনো দুর্ঘটনায় নিভে যাচ্ছে একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জীবন, কোথাও বাবা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে সন্তান, আবার কোথাও স্বজন হারানোর শোকে ভেঙে পড়ছে পুরো পরিবার। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের অসতর্কতা ও ক্লান্তি, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যার কারণে দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার ঘটনা এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের চাপায় এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যুর ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তার দুর্বলতা সামনে এনেছে। এসব দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং যানবাহনের নিরাপত্তা, চালকদের কর্মঘণ্টা, শারীরিক সক্ষমতা এবং পরিবহন খাতের জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অপরিকল্পিত সড়ক, অতিরিক্ত গতি, চালকের ক্লান্তি, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালককে দায়ী করা কিংবা জরিমানা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা।
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। বাসের চালক ও সহকারী পেছনের আসনে ঘুমাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। এ তথ্য সত্য হলে বাস পরিচালনায় দায়িত্ব বণ্টন, চালকের বিশ্রাম এবং নিরাপদ কর্মপদ্ধতি অনুসরণের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া, নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে দায়িত্ব পালন কিংবা চালকের পরিবর্তে অন্য কারও গাড়ি চালানোর মতো পরিস্থিতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে নাটোরের দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সহায়তা এবং দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়ি ফেরা হলো না পুলিশ কনস্টেবলের
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের চাপায় হিটলার বিশ্বাস নামের এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু সড়ক নিরাপত্তার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক সামনে এনেছে। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের বাবলাতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হিটলার বিশ্বাস পূজার ছুটিতে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় পেছন থেকে একটি বাস তাঁকে চাপা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায় বলে জানানো হয়েছে।
ছুটিতে পরিবারের কাছে ফেরার পথে এমন মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সড়কে নিরাপত্তার অভাব যেকোনো মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা এবং দায়ী যানবাহন ও চালককে শনাক্ত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সড়কে দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন শনাক্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত করা জরুরি।
সড়কে মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়, ভেঙে পড়ে একটি পরিবার
প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পর সংবাদে উঠে আসে নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা। কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে থেকে যায় অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ।
যে মানুষটি সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন, তাঁর উপার্জনের ওপর হয়তো নির্ভর করে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা কিংবা ঘরভাড়ার খরচ। দুর্ঘটনায় সেই মানুষটির মৃত্যু হলে পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে।
কোনো শিশু হারায় তার বাবাকে, কোনো স্ত্রী হারান জীবনসঙ্গীকে, আবার কোনো পরিবার হারায় একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালেও একটি পরিবার দীর্ঘদিন চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
তাই সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল পরিবহন বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবিক সংকটের বিষয়।
১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় লক্ষাধিক প্রাণহানির তথ্য
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। তবে দুর্ঘটনা ও হতাহতের হিসাব বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করে। ফলে তথ্যের সংজ্ঞা, সংগ্রহের সময়সীমা এবং গণনার পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়ে পরিসংখ্যান তুলনা করা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্যের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। দুর্ঘটনার স্থান, কারণ, যানবাহনের ধরন, চালকের অবস্থা এবং হতাহতের তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো শনাক্ত করা সহজ হবে।
শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন সড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন ধরনের যানবাহন বেশি জড়িত, চালকের ক্লান্তি কতটা ভূমিকা রাখছে এবং দুর্ঘটনার পর কত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেও হাজারো প্রাণহানি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত হন। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ৪ হাজার ২৮৫টি দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ১৫৭ জনের মৃত্যু এবং ৫ হাজার ৩৯১ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে, তারপরও প্রাণহানির এই সংখ্যা সড়ক নিরাপত্তায় কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
দুর্ঘটনা কমাতে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ কিংবা মহাসড়ক সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। সড়কের নকশা, যানবাহনের গতি, চালকের দক্ষতা, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন: দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি
দেশের সড়কে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং, বাতি, সাসপেনশন কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিপুলসংখ্যক যানবাহনের বৈধ ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই। তবে এসব যানবাহনের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণে বিআরটিএর সর্বশেষ সরকারি ডাটাবেজ ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ফিটনেস সনদ না থাকা মানেই প্রতিটি যানবাহন যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ—এমন নয়। একইভাবে ফিটনেস সনদ থাকলেই একটি গাড়ি সব সময় নিরাপদ থাকবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। তাই কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি কার্যকর যান্ত্রিক পরীক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সড়কে চলাচলের উপযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেস পরীক্ষায় অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং আইন প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়কে চলাচলের সুযোগ পায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় আধুনিক পরীক্ষাব্যবস্থা, স্বচ্ছ পরিদর্শন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অনিবন্ধিত ও ধীরগতির যানবাহনেও বাড়ছে ঝুঁকি
মহাসড়কে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে অটোরিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি এবং অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও অন্যান্য যানবাহন নিবন্ধন এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধিবিধানের বাইরে চলাচল করছে। তবে অনিবন্ধিত যানবাহনের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও শ্রেণিভিত্তিক হিসাব সরকারি সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
সমস্যার সমাধান শুধু এসব যানবাহন নিষিদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোথায় কোন ধরনের যান চলবে, কোন সড়কে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে এবং বিকল্প যাতায়াতব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি থাকা জরুরি।
স্থানীয় সড়ক ও মহাসড়কের মধ্যে যান চলাচলের উপযোগী পার্থক্য নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় স্থানে আলাদা লেন এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
চালকের ক্লান্তি ও ঘুম: নীরব বিপদের কারণ
দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং অতিরিক্ত কর্মচাপ চালকের মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার গতি কমিয়ে দিতে পারে। ঘুমঘুম অবস্থায় গাড়ি চালালে সামনে থাকা যানবাহন, রাস্তার বাঁক কিংবা হঠাৎ সামনে চলে আসা পথচারীকে সময়মতো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নাটোরের দুর্ঘটনার সময় বাসের চালক ও সহকারী পেছনের আসনে ঘুমাচ্ছিলেন বলে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা চালকদের বিশ্রাম ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে দুর্ঘটনার সঙ্গে তাঁদের অবস্থার সম্পর্ক নিশ্চিত করতে তদন্তের ফল প্রয়োজন।
দূরপাল্লার পরিবহনে চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, বিকল্প চালকের ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব পালনের সময় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবহন মালিকদেরও চালকদের ওপর অতিরিক্ত ট্রিপ বা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর অযৌক্তিক চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
চালকের ক্লান্তি শনাক্ত করা এবং বিশ্রাম নিশ্চিত করা শুধু চালকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি পরিবহন প্রতিষ্ঠান, মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের যৌথ দায়িত্ব।
চালকদের দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই জরুরি
সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় যানবাহনের ফিটনেসের পাশাপাশি চালকের শারীরিক সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চালকের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হলে দূরের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক, পথচারী কিংবা সামনে থাকা যানবাহন শনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ করে রাতের বেলায় আলো ও ছায়ার পরিবর্তন, বিপরীত দিকের গাড়ির হেডলাইট এবং কম দৃশ্যমানতার পরিস্থিতিতে দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চোখের ছানি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসজনিত দৃষ্টিজটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা চালকের নিরাপদে গাড়ি চালানোর সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে চালকদের মধ্যে কত শতাংশ দৃষ্টিসমস্যায় ভুগছেন, তা নির্ধারণে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনাভিত্তিক গবেষণা ও হালনাগাদ স্বাস্থ্য পরীক্ষার তথ্য প্রয়োজন। নির্দিষ্ট কিছু টার্মিনালে পরিচালিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলকে দেশের সব চালকের অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
পেশাদার চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী চক্ষু পরীক্ষা এবং শনাক্ত সমস্যার চিকিৎসা নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে চালকদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের যানবাহনকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, ভুলভাবে হেলমেট পরা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে মোটরসাইকেল আরোহীরা গুরুতর দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়েন।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বেশি হওয়ায় তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, গতিসীমা মেনে চলা, লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং বিপজ্জনক চালনার বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পথচারী এবং অন্যান্য যানবাহনের ব্যবহারকারীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা কেবল একজন চালকের আচরণের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসাবের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, বাসের চাপায় পথচারী হিসেবে মৃত্যু এবং যানবাহনের যাত্রী হিসেবে প্রাণহানির ঘটনাও রয়েছে।
শিশুরা সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের একটি। স্কুলের সামনে দ্রুতগতির যানবাহন, ফুটপাত দখল, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা এবং চালকদের অসতর্কতা শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
শিশুদের নিরাপত্তায় স্কুলের সামনে গতিসীমা কার্যকর করা, নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপার তৈরি, প্রয়োজনীয় স্থানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহনে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সড়ক ব্যবহারের নিয়ম শেখাতে হবে। তবে শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর।
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে সংস্থাভেদে পার্থক্য কেন?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে। পুলিশ, বিআরটিএ, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, একই বছরের সরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কম ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ধরনের পার্থক্যের পেছনে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, মৃত্যুর সংজ্ঞা, হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য, দুর্ঘটনার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মৃত্যু গণনার নিয়ম এবং প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই এসব পরিসংখ্যানকে একই পদ্ধতিতে সংগৃহীত তথ্য হিসেবে সরাসরি তুলনা করা উচিত নয়। বরং একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তুলে দুর্ঘটনার কারণ, হতাহতের সংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নির্ভুলভাবে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।
নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোন এলাকায় কী ধরনের ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক, বিপজ্জনক মোড়, অতিরিক্ত গতির প্রবণতা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির ধরন শনাক্ত করা গেলে প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা আরও কার্যকর হতে পারে।
সড়ক নিরাপত্তায় বৈশ্বিক লক্ষ্য ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।
জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তার দ্বিতীয় দশক ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময়ের বৈশ্বিক লক্ষ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা।
এই লক্ষ্য অর্জনে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিয়ন্ত্রিত গতি, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধু দিবস পালন বা সচেতনতামূলক প্রচার চালালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন ও জবাবদিহির দাবি
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা কমাতে চালক, যানবাহন, সড়ক অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। সড়কের নকশাগত ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকদের অদক্ষতা, অতিরিক্ত গতি ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বক্তব্য অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের নির্ভুলতা ও বর্তমান সরকারি অবস্থান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
সমন্বিত আইন প্রণয়ন করা হলে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইন থাকলেও যদি যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকের লাইসেন্স যাচাই, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনার তদন্ত যথাযথভাবে না হয়, তাহলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।
দুর্ঘটনার পর তদন্তের অগ্রগতি, দায় নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরিমানা করে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় শুধু মামলা ও জরিমানার ওপর নির্ভর করলে হবে না। চালকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যানবাহনের কার্যকর ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীও পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সড়কনির্ভর পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। আধুনিক যান্ত্রিক পরীক্ষাব্যবস্থা, সড়কের নকশাগত ত্রুটি সংশোধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের এসব মতামত থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যক্তি, পরিবহন মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকারের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ববোধ তৈরি করা জরুরি।
সড়কে প্রাণহানি কমাতে এখনই যেসব পদক্ষেপ জরুরি
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, ফিটনেস পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: যানবাহনের যান্ত্রিক অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষায় অনিয়ম ও জাল সনদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা: দূরপাল্লার পরিবহনে চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বিকল্প চালক এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাড়ানো: পেশাদার চালকদের দৃষ্টিশক্তি ও অন্যান্য শারীরিক সক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
চতুর্থত, গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা: ঝুঁকিপূর্ণ গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং আইন অমান্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চমত, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংস্কার করা: দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড়, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বিপজ্জনক বাঁক এবং পথচারী পারাপারের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করতে হবে।
ষষ্ঠত, মহাসড়কে যান চলাচলের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা: যানবাহনের ধরন ও গতির পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত লেন ব্যবস্থাপনা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তমত, দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা: জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধারকর্মী, ট্রমা চিকিৎসা এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে, যাতে দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
অষ্টমত, তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা: প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ, তদন্তের ফল প্রকাশ এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে।
শোকবার্তা নয়, কার্যকর পরিবর্তন চান সড়ক ব্যবহারকারীরা
সড়ক দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ, তদন্তের ঘোষণা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিটি ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোনো চালকের অবহেলা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে যানবাহনের ত্রুটি, মালিকের দায়িত্বহীনতা, ফিটনেস পরীক্ষায় অনিয়ম কিংবা সড়কের নকশাগত ত্রুটি দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু চালক বা পথচারীর নয়। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, প্রকৌশলী এবং সড়ক ব্যবহারকারী—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
নাটোরে ১৪ জনের প্রাণহানি কিংবা ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে না যায়। এসব দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে নিহতদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
সড়ক নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক জীবনের সুরক্ষার প্রশ্ন। ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকদের সুস্থতা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং আইন প্রয়োগে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দৃশ্যমান বাস্তবায়ন—যাতে মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন।

