বাংলাদেশে গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। বিপরীতে, একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখ। ফলে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের বড় একটি অংশের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি। তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মী তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এ পরিকল্পনায় দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা শেষে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ও এ বিষয়ে সংস্থাটির পরিকল্পনা জানতে প্রশ্ন পাঠানো হলে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরিন আহমেদ মাহবুবের পাঠানো লিখিত জবাবে জ্যঁ পেসমে এসব কথা বলেন।
শ্রমবাজারে বাড়ছে চাপ, কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, এই দুই সংখ্যার ব্যবধান প্রায় ৫৩ লাখ। তবে এ ব্যবধানকে সরাসরি বেকার তরুণের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না; কারণ শ্রমবাজারে প্রবেশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্বের হিসাব নির্ধারণে পৃথক পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞা রয়েছে।
তবু এই চিত্র বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে বা নতুনভাবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করা না গেলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়; সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নতুন চাকরি সৃষ্টি, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কার্যকর সংযোগ থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্প, সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাভিত্তিক খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যে বেসরকারি খাতকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ব্যবসা সম্প্রসারণের বাধা দূর করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা গেলে নতুন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী নিয়োগের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমেছে
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। জ্যঁ পেসমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে।
দুই বছরের ব্যবধানে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট। এই প্রবণতা নারীদের কর্মসংস্থান, আয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সুবিধা, শিশু পরিচর্যার সুযোগ এবং নিয়োগে বৈষম্য কমানোর মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে নারীদের জন্য উপযোগী কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁদের অর্থায়নপ্রাপ্তি সহজ করাও প্রয়োজন।
নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে গেলে দেশের সামগ্রিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের সম্ভাবনা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায় না। তাই কর্মসংস্থান নীতিতে নারী ও তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
কর্মসংস্থান বাড়াতে তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিশ্বব্যাংকের
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
প্রথমত, দক্ষতা উন্নয়ন: শ্রমবাজারে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান থাকতে পারে। এ ব্যবধান কমাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানো, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজানো প্রয়োজন।
জ্যঁ পেসমের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা উন্নয়ন শুধু নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগ বাড়ায় না; কর্মীদের উৎপাদনশীলতা, আয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের সম্ভাবনাও উন্নত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন: দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরকেন্দ্রিক রেখে উন্নয়ন টেকসই করা সম্ভব নয় বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় শিল্প অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হবে।
অবকাঠামো উন্নত হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিবহন ব্যয় কমানো, পণ্য বাজারজাত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণ সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে নতুন শিল্প ও ব্যবসা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা সংস্কার: ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং নীতিমালার পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অধিকসংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহজ হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া বাড়বে না বেসরকারি বিনিয়োগ
বাংলাদেশে শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
জ্যঁ পেসমে বলেছেন, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বশর্ত হলো জ্বালানি নিরাপত্তা।
শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ও বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনায় শুধু ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থায়ন নয়, বরং শিল্প পরিচালনার মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে জোর
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠান নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা, স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবা সরবরাহ এবং শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তবে অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা এবং বাজারে প্রবেশের বাধা অনেক উদ্যোক্তার সম্প্রসারণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পথে প্রতিবন্ধকতা কমাতে হবে।
ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজ হলে উদ্যোক্তারা নতুন পণ্য ও সেবা চালু করতে এবং ব্যবসার পরিধি বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারেন। এতে নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও বাজারসংযোগের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু অর্থায়ন বাড়ালেই কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধান হবে না। বিনিয়োগ যেন উৎপাদনশীল খাতে যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেন টেকসইভাবে পরিচালিত হতে পারে এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের সহযোগিতা কাঠামো তৈরি করছে বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের জন্য একটি নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরির কাজ করছে।
জ্যঁ পেসমে জানিয়েছেন, এ কাঠামোর মূল লক্ষ্য হবে বেসরকারি খাতে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য শুধু নির্দিষ্ট প্রকল্পে সহায়তা নয়; বরং বিনিয়োগ, দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক পরিবেশের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে বাংলা ট্রিবিউনের প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন অর্থায়নের নির্দিষ্ট পরিমাণ, সম্ভাব্য চাকরির লক্ষ্যমাত্রা কিংবা বাংলাদেশের সরকারি ঋণের ওপর চাপ কমাতে কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন উদ্যোগের ঘোষণা দেয়নি। সংস্থাটির বক্তব্যে মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত বাধা দূর করার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
ফলে নতুন সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া হবে, কোন খাতে কত অর্থায়ন করা হবে এবং এর মাধ্যমে কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।
বিশ্বজুড়েও তরুণদের কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ
তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এর আগে বলেছিলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। বিপরীতে, একই সময়ে প্রায় ৪০ কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে প্রবেশকারী বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনাও রয়েছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারলে তা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নয়নে একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একদিকে তরুণদের বাজারোপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যমান কাজের মান উন্নয়নের সুযোগ বাড়তে পারে।
গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে ৮৭ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির তথ্য বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, আগামী বছরগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে এবং নতুন সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনা যাবে।

