শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সৃজনশীল বিকাশের কেন্দ্র হওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসের আবাসিক হল, ছাদ, কক্ষ কিংবা নির্জন স্থানে যদি নিয়মিত মাদকসেবনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু শিক্ষার পরিবেশ নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) মাদকসেবনকে কেন্দ্র করে পাওয়া একাধিক অভিযোগ এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর বিভিন্ন কক্ষ ও ছাদে রাতের বেলায় মদ, গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের আসর বসে। সন্ধ্যার পর লাইব্রেরির সামনেও গান-বাজনার আড়ালে গাঁজা সেবনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অ্যাকাডেমিক ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত ইএসই কর্নারসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন নির্জন স্থানেও মাদকসেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি আবাসিক হল—জি.এম.এ.জি. ওসমানী হল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল ও শহিদ আজিজ হলকে ঘিরে এসব অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের স্থান ও ধরন বিবেচনায় হল প্রশাসনের নজরদারি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিন আবাসিক হল ঘিরে মাদকসেবনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওসমানী হলের ছাদ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলার কয়েকটি কক্ষে রাতের বেলায় মাদকসেবনের আসর বসে। শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এসব কর্মকাণ্ডের প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার কয়েকটি স্থান এবং ছাদের নির্দিষ্ট অংশে নিয়মিত গাঁজা সেবনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কক্ষের সামনের বারান্দায় বসেও মাদক সেবন করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, শহিদ আজিজ হলের ছাদ ও কয়েকটি কক্ষেও গাঁজা সেবনের অভিযোগ রয়েছে। এসব আসরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কিছু শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষক এবং নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য ও প্রশাসনিক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
লাইব্রেরি, ইএসই কর্নার ও ল্যাবের আশপাশেও অভিযোগ
আবাসিক হলের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে মাদকসেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনের এলাকায় গান-বাজনার আড়ালে গাঁজা সেবন করা হয়।
অ্যাকাডেমিক ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে অবস্থিত ইএসই কর্নারকেও মাদকসেবনের অভিযোগের একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সন্ধ্যার পর একদল শিক্ষার্থীর জড়ো হওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কিছু কর্মীর উপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে অডিটোরিয়ামের ভেতরে, মঞ্চের সামনের অংশে, কটন প্রসেসিং ল্যাব ও ডাইস ল্যাবের আশপাশে গাঁজা ও মদ সেবনের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের এসব স্থানে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় মাদকসেবনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মাদকে জড়ানোর আশঙ্কা
মাদকসেবনের অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সিনিয়রদের প্রভাব ও প্ররোচনায় জুনিয়রদের মাদক ব্যবহারে জড়িয়ে পড়া নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেলামেশার সূত্র ধরে নতুন শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মাদকসেবনের দিকে ঝুঁকছেন। এভাবে একজনের মাধ্যমে অন্যজনের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম ও ৫০তম ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাদকসেবনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে ৪৫তম ও ৪৭তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী এবং কিছু বহিরাগত ব্যক্তির যোগাযোগ থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ব্যাচ বা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের মতে, মাদকসেবনের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র, বহিরাগতদের সংশ্লিষ্টতা কিংবা মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
বিধিমালায় শাস্তির বিধান, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শৃঙ্খলা বিধিমালায় মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিধিমালার ৩(গ) ধারা অনুযায়ী, মাদক বহন, ক্রয়-বিক্রয় এবং অন্যকে মাদক গ্রহণে প্ররোচিত করা নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, ৪(ক) ধারায় হলের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য হল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা প্রভোস্টকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থাৎ মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়মেই রয়েছে। এরপরও আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মাদকসেবনের অভিযোগ ওঠায় এসব বিধান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্তের ঘাটতি রয়েছে। তাঁদের মতে, শুধু বিধিমালায় শাস্তির বিধান রাখলেই হবে না; অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভর্তি পরীক্ষায় ডোপ টেস্ট চালুর দাবি
ক্যাম্পাসে মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় ডোপ টেস্ট চালুর দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাঁদের মতে, যথাযথ নীতিমালা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা নিশ্চিত করে এ পরীক্ষা চালু করা গেলে মাদক ব্যবহারের প্রবণতা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
তবে ডোপ টেস্ট চালুর ক্ষেত্রে পরীক্ষার উদ্দেশ্য, আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি, পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা, গোপনীয়তা এবং ফলাফলের ভিত্তিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মাদকসেবনের ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তাঁরা নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ব্যাচের এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হল কর্তৃপক্ষ যদি মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা একত্র হয়ে নিজেরাই তাঁদের হল থেকে বিতাড়িত করব।”
তবে শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভের মধ্যেও অভিযোগের তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রশাসনের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া জরুরি। অন্যথায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাউকে হল থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা নতুন করে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযোগের স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস প্রক্টরের
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সজাগ রয়েছে। ক্যাম্পাসের অধিকাংশ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও কিছু স্থানে নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যামেরার ফুটেজ দেখে মাদকসেবন শনাক্ত করাও কঠিন।
তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া স্থানগুলোতে পুনরায় নজরদারি ও তল্লাশির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে হল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রক্টর আরও বলেন, প্রয়োজনে মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হবে। ডোপ টেস্ট চালুর বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির দাবি
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মাদকসেবনের অভিযোগ শিক্ষার পরিবেশ, আবাসিক হলের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা, মাদক সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে আবাসিক হলগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারি, সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরামর্শ ও সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বুটেক্সের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং প্রক্টরের আশ্বাসের পর এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নেয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমেই ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব রাখার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে পারে।

