ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

menu

মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত, তবু নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন?

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম

মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত, তবু নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন?

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে মাদক পাচার ও কারবার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ এবং হাজার হাজার মানুষের গ্রেপ্তারের পরও থামছে না মাদকের বিস্তার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭ জেলার ১৮৭টি উপজেলায় মাদক পাচারের ২৯৬টি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৮টি উপজেলায় রয়েছে ২৪১টি রুট।

অন্যদিকে, রাজধানীর ৫০টি থানার আওতায় মাদক স্পটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ৫১৩ জনকে তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় হাজার হাজার চোরাকারবারির তথ্যও রয়েছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর কাছে। তবু সীমান্তপথ, নদী, সমুদ্র, সড়ক ও আকাশপথ ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি কুশ, আইস, এমডিএমএ, এলএসডি ও অন্যান্য অপ্রচলিত মাদক উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের অপব্যবহারের আশঙ্কাও সামনে এসেছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ এখন শুধু সীমান্তে চালান আটকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস, বিক্রেতা ও মূল হোতাদের শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

চালের ড্রামে ৩৪ হাজার ইয়াবা, তদন্তে উঠে আসে সরবরাহ নেটওয়ার্ক

রাজধানীর ভাটারা থানার ছোলমাইদ ঢালিবাড়ী কাঁচাবাজারসংলগ্ন একটি বাসায় গত ১৩ অক্টোবর রাতে অভিযান চালিয়ে ৩৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। চালের ড্রামে কাগজ ও স্কচটেপে মোড়ানো ১৭টি প্যাকেটে এসব ইয়াবা রাখা ছিল। এ ঘটনায় মালা বেগম (৬২) ও তাঁর ছেলে মামুন চোকদারকে (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএনসির তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা ইয়াবার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২ লাখ টাকা। তদন্তে ইয়াবার প্রকৃত মালিক হিসেবে সাহিদা বেগম ইতির নাম উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কক্সবাজার থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে মালা বেগমের বাসায় মজুত রাখতেন। পরে সেখান থেকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সাইনবোর্ড ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব মাদক সরবরাহ করা হতো।

এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ‘লন্ডন এক্সপ্রেস’ নামের একটি বাসে অভিযান চালিয়ে হেলপার শান্ত দেব ওরফে বিপ্লবের কাছ থেকে ২ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ডিএনসি ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয় জানতে পারে, চালানটি বিক্রির উদ্দেশ্যে কক্সবাজার থেকে আনা হয়েছিল।

এসব ঘটনায় মাদক পরিবহনকারী বা মজুতকারীদের পাশাপাশি সরবরাহের উৎস, অর্থদাতা এবং বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়ার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার গুরুত্ব সামনে এসেছে। কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে বাহক বা মজুতকারীদের গ্রেপ্তার করা হলেও সরবরাহব্যবস্থার অন্য অংশ সক্রিয় থাকলে একই রুটে নতুন চালান আসার ঝুঁকি থেকে যায়।

সোনামসজিদ সীমান্তেও বাড়ছে নজরদারির প্রয়োজন

গত ১৩ জুলাই রাজধানীর গাবতলী এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্রসহ কোডিনযুক্ত ৫৫০ বোতল ‘এস্কাফ’ উদ্ধারের কথা জানায় গোয়েন্দা পুলিশ। আটক চালককে জিজ্ঞাসাবাদে চালানটি ভারত সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় আনার তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি সোনামসজিদ সীমান্তও মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত। ফলে মাদক পাচার ঠেকাতে শুধু পরিচিত রুটে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; রুট পরিবর্তন, পরিবহনপদ্ধতি এবং সরবরাহ নেটওয়ার্কের গতিবিধিও নিয়মিত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

২৯৬ মাদক রুটের ২৪১টিই সীমান্তবর্তী এলাকায়

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭ জেলার ১৮৭টি উপজেলায় মোট ২৯৬টি মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত রয়েছে। এর মধ্যে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৮টি উপজেলায় রয়েছে ২৪১টি রুট।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও জয়পুরহাট। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে রয়েছে বান্দরবান, কক্সবাজার ও রাঙামাটি। রাঙামাটি দুই দেশের সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে মাদক পাচারের সবচেয়ে বেশি রুট চিহ্নিত হয়েছে রাজশাহী বিভাগে—৮১টি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪টি, ঢাকা বিভাগে ৪২টি, খুলনা বিভাগে ৩৫টি, রংপুর বিভাগে ২৫টি, সিলেট বিভাগে ২০টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৬টি এবং বরিশাল বিভাগে ১৩টি রুট রয়েছে।

এই পরিসংখ্যান সীমান্ত ও দেশের অভ্যন্তরে মাদক পরিবহনের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে রুট চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রতিটি রুটে কোন ধরনের মাদক পরিবহন হয়, কারা জড়িত এবং কোন পর্যায়ে চালান সরবরাহ করা হয়—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিভাগভিত্তিক মাদক পাচারের রুট

ডিএনসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগভিত্তিক চিহ্নিত রুটের সংখ্যা হলো—

রাজশাহী বিভাগ: ৮১টি
চট্টগ্রাম বিভাগ: ৬৪টি
ঢাকা বিভাগ: ৪২টি
খুলনা বিভাগ: ৩৫টি
রংপুর বিভাগ: ২৫টি
সিলেট বিভাগ: ২০টি
ময়মনসিংহ বিভাগ: ১৬টি
বরিশাল বিভাগ: ১৩টি

রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী উপকূলীয় এলাকায় ইয়াবা পাচার দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক প্রবেশের ঘটনাও বিভিন্ন অভিযানে উঠে এসেছে।

সমুদ্রপথে পাচারের নতুন ঝুঁকি, নজরে পটুয়াখালী উপকূল

স্থলসীমান্তের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মাদক পাচারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ডিএনসির গবেষণার বরাতে দেওয়া তথ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অবস্থানকে মাদক পাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা পরিচিত পথের পাশাপাশি নতুন রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের প্রচলিত পথের বাইরে পটুয়াখালী উপকূল এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকাও নজরদারির আলোচনায় এসেছে।

সমুদ্রপথে বড় চালান পরিবহনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় নজরদারি, নৌযান তল্লাশি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রুটে পাচারের মাত্রা কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ জব্দের পরিসংখ্যান প্রয়োজন।

আকাশপথে আসছে অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’

প্রচলিত ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি আকাশপথে অপ্রচলিত মাদক প্রবেশের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২৪ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রিন চ্যানেলে কাস্টমস তল্লাশির সময় ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশসহ ভারতীয় নাগরিক জুলফিকার মোল্লাকে আটক করা হয় বলে ডিএনসির তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তিনি ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন। তিন দিন ঢাকায় অবস্থান করে কুশ নিয়ে ভারতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে জানা যায়।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অভিযানে ১৩ ধরনের অপ্রচলিত মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে খাত, আইস, এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হিরোইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি।

নতুন ধরনের মাদক শনাক্ত করতে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, রাসায়নিক বিশ্লেষণ, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন মাদক সম্পর্কে জনসচেতনতা ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল লেনদেনের অপব্যবহারের আশঙ্কা

মাদক পাচার ও বিক্রির মাধ্যমও বদলাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডার্ক ওয়েবের অপব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ ও লেনদেন পরিচালিত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর এবং মোবাইল আর্থিক সেবার অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।

এ ধরনের অপরাধ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে, কারণ যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের তথ্য বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। তাই মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সাইবার তদন্ত, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের দক্ষতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

রাজধানীর ৫০ থানায় ৫১৩ জনের তালিকা

রাজধানীতে মাদক স্পটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ৫০ থানার আওতায় ৫১৩ জনকে তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে মিরপুর বিভাগে ১০১ জন, মতিঝিলে ৭০ জন, ওয়ারীতে ৬০ জন, রমনায় ৫৮ জন, লালবাগে ৫৮ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৭ জন, গুলশানে ৫৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ৫২ জনের নাম রয়েছে।

তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারিত হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পুলিশ শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে। অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর কেউ পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

মাদক মামলা ও গ্রেপ্তার বাড়ছে

ডিএনসির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর সারা দেশে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ২৮ হাজার ৪০৯টি মামলা দায়ের এবং ৩০ হাজার ১৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ৪২ হাজার ২২২টি অভিযান চালিয়ে ১১ হাজার ৯৬৮টি মামলা করা হয় এবং ১২ হাজার ৩২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ওই সময় পর্যন্ত ৩০ হাজার ৭৪৪টি অভিযান পরিচালনা করে ৯ হাজার ২৫১টি মামলা করা হয়েছে এবং ৯ হাজার ৬৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের বরাত দিয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৫১ হাজার ৭৩৬টি মাদক মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩ হাজার ৩৭২টিতে। অর্থাৎ, প্রথম নয় মাসেই ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় ১ হাজার ৬৩৬টি বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৪ হাজার ৯২২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৩৫৯টি, মার্চে ৫ হাজার ৬২টি, এপ্রিলে ৫ হাজার ৭০৬টি, মে মাসে ৭ হাজার ৯২টি, জুনে ৬ হাজার ৫৮০টি, জুলাইয়ে ৬ হাজার ৩৮৩টি, আগস্টে ৭ হাজার ১৬৭টি এবং সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার ১০১টি মামলা হয়েছে।

তবে মামলা বৃদ্ধির অর্থ শুধু মাদক পাচার বা সেবন বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযান, মামলা দায়েরের প্রবণতা, আইন প্রয়োগের মাত্রা এবং অপরাধ শনাক্তের সক্ষমতাও পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে মামলা, জব্দ, গ্রেপ্তার, দণ্ড এবং মাদকাসক্তির হালনাগাদ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বিজিবির অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৬২৪ কোটি টাকার মাদক জব্দ

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বাজারমূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।

উদ্ধার করা মাদকের মধ্যে রয়েছে ৪ কোটি ১৫ লাখ পিস ইয়াবা, ১ লাখ ৬৩ হাজার বোতল ফেনসিডিল, ২ লাখ ১ হাজার বোতল বিদেশি মদ, ২৮ হাজার বোতল বিয়ার, ৩৫ হাজার ৮৮৮ কেজি গাঁজা, ৬২ কেজি হেরোইন, ৪৩ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ১৪ কেজি কোকেন, ১২ কেজি কুশ, ১ কেজি আফিম এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য।

বিজিবি জানিয়েছে, এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়েছে এবং মাদক ও চোরাচালান-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ৩ হাজার ৩৯০ জনকে আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের পরিসংখ্যান সীমান্তে অভিযান পরিচালনার ব্যাপ্তি তুলে ধরে। তবে পাচার নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য মূল্যায়নের জন্য জব্দের পাশাপাশি পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অর্থের উৎস শনাক্ত করা এবং পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হারও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাহক গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার অভিযোগ

মাদকবিরোধী অভিযানে বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও সরবরাহ নেটওয়ার্কের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু চালান জব্দ বা পরিবহনকারীকে গ্রেপ্তার করলেই মাদক ব্যবসার কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। মাদক সংগ্রহ, মজুত, পরিবহন, বিতরণ এবং অর্থ লেনদেনের প্রতিটি স্তর অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে মাদক মামলার তদন্তে আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ, সম্পদের উৎস যাচাই, আন্তঃজেলা যোগাযোগ শনাক্ত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মাদক কারবার ঘিরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের উদ্বেগ

মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার এবং বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, নোয়াখালীর সেনবাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, গাজীপুরের টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি ঘটনার কথা উঠে এসেছে।

জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে। একইভাবে দেশের অন্য এলাকাগুলোতেও মাদক ব্যবসা বা মাদকসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তে এসেছে।

তবে প্রতিটি ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার আগে নির্ভরযোগ্য তদন্তের ফলাফল দেখা প্রয়োজন।

মাদক নিয়ন্ত্রণে ডিএনসির ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ

ডিএনসির ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ-২০২৫’-এর বরাতে দেওয়া তথ্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে।

১. দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত: ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্তের অনেক অংশ নদীবেষ্টিত, দুর্গম ও নজরদারির জন্য চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এসব পথ দিয়ে ছোট ছোট চালান প্রবেশের ঝুঁকি থাকে।

২. প্রযুক্তির অপব্যবহার: অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে মাদকসংক্রান্ত যোগাযোগ পরিচালিত হলে অপরাধ শনাক্ত করা জটিল হতে পারে।

৩. অর্থের উৎস শনাক্ত করা: ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি বা হাওয়ালার মতো অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তকে কঠিন করে তুলতে পারে।

৪. জনবল ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা: আধুনিক স্ক্যানার, ড্রোন, সাইবার নজরদারি সরঞ্জাম, পরীক্ষাগার এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব মাদক শনাক্ত ও তদন্তের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

৫. বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা: মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ, প্রসিকিউশন এবং বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগলে অপরাধ দমনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।

৬. সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ: বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মানসিক চাপ এবং মাদক সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি কিছু মানুষকে মাদক সেবন বা কারবারের ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগও জরুরি।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে অন্য সংস্থা, রুট ধরে অভিযান চালায় ডিএনসি

ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিদপ্তর নিয়মিত কার্যক্রম ও অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই তাদের কাজ করতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ডিএনসির হাতে নেই; সেখানে অন্য সংস্থাগুলো কাজ করে। ডিএনসি মূলত মাদক পাচারের রুট চিহ্নিত করে এবং নির্দিষ্ট রুট ধরে অভিযান পরিচালনা করে।

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে চালান প্রবেশের আগেই তথ্য সংগ্রহ, দেশের ভেতরে পরিবহন শনাক্ত এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।

আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তে সক্রিয় মাদক পাচারকারী ও চোরাকারবারিদের বিষয়ে বিজিবির কাছে গোয়েন্দা তথ্য ও তালিকা রয়েছে। চিহ্নিত ব্যক্তি ও চক্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ বিজিবির অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত ও বিশেষ টহল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিজিবির এ কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, দেশের অভ্যন্তরে মাদকের চাহিদা আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রকে উৎসাহিত করে। তাই সীমান্তে নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি দেশের ভেতরের সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং মাদকের চাহিদা কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।

মাদক নির্মূলে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তরুণ সমাজকে মাদক ও জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা সরকারের অঙ্গীকারের অংশ। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেছেন, মাদক সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সুশীল সমাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মাদক প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রম, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণ এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

‘বাহক নয়, ধরতে হবে মূল হোতা ও অর্থদাতাদের’

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু মাদক বহনকারীকে গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং অবৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস শনাক্ত করে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরীও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি আর্থসামাজিক কারণ মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও হতাশার মতো সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় বা প্রশাসনিক পর্যায়ে কোনো ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের এসব বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, মাদক নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ বন্ধ করা এবং মাদকের চাহিদা কমানো—দুই দিকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সামনে যে পদক্ষেপগুলো জরুরি

মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি আনতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:

রুটভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি: চিহ্নিত ২৯৬টি রুটের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে নতুন রুট শনাক্ত করা।
আন্তঃসংস্থার সমন্বয়: ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা।
মূল হোতা ও অর্থদাতাদের শনাক্তকরণ: বাহক গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, সম্পদ ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক তদন্ত করা।
ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি: অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত অপরাধ শনাক্তে বিশেষায়িত দক্ষতা বাড়ানো।
আধুনিক পরীক্ষাগার ও সরঞ্জাম: নতুন ধরনের মাদক দ্রুত শনাক্ত করতে রাসায়নিক পরীক্ষাগার, স্ক্যানার ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি শক্তিশালী করা।
দ্রুত ও কার্যকর বিচার: মাদক মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে মাদকের চাহিদা কমানো।
শেষ কথা

দেশে মাদক পাচারের ২৯৬টি রুট চিহ্নিত, রাজধানীতে শত শত সন্দেহভাজন কারবারির তালিকা রয়েছে এবং সীমান্তে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হচ্ছে। তবু মাদক পাচার ও বিক্রি বন্ধ না হওয়া ইঙ্গিত দেয়, কেবল অভিযান ও গ্রেপ্তার দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে নজরদারি, দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অর্থদাতা ও মূল হোতাদের শনাক্ত করা, দ্রুত বিচার এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—সবকিছুকে একই কৌশলের অংশ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাদকবিরোধী কার্যক্রমের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত কেজি বা কত পিস মাদক জব্দ হলো, কিংবা কতজন গ্রেপ্তার হলেন—তা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। বরং পাচারের নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল হলো, মাদকের সহজলভ্যতা কতটা কমল এবং নতুন প্রজন্মকে আসক্তি থেকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল—এসব সূচকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!