ঢাকা রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

menu

ইরানের নতুন সামরিক প্রস্তুতি, ৭০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার দাবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১০:১৫ এএম

ইরানের নতুন সামরিক প্রস্তুতি, ৭০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার দাবি

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হলে তার জবাব দিতে ভৌগোলিক সীমারেখা বিবেচনা করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। সম্ভাব্য পাল্টা হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোর লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বা ‘টার্গেট ব্যাংক’ হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

ইরানের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং অন্যান্য কৌশলগত সম্পদও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭০০টির বেশি নতুন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিতের দাবি

আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি রসুল সরদারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে ৭০০টির বেশি নতুন কৌশলগত স্থান ও স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব স্থাপনার মধ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বড় মার্কিন কোম্পানি এবং তাদের ডিজিটাল ও ভৌত অবকাঠামোও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইরানের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সংঘাতের পরিধি সামরিক স্থাপনার বাইরে বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তি খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি সরবরাহ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে নতুন নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে ৭০০টির বেশি স্থাপনার তালিকা, সেগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের আগের হামলা

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর, কুয়েত ও জর্ডানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি এবং ইরাকের আধাস্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের এরবিলে কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে হামলার কথা উঠে এসেছে। এসব হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

আমাজনের ডাটা অবকাঠামো ধ্বংসের দাবি

ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) এর আগে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আমাজনের কেন্দ্রীয় ডাটা অবকাঠামো ধ্বংস করার দাবি করেছিল। তবে ওই দাবির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নতুন নির্দেশনার তাৎপর্য হলো, সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে শুধু সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে ইরানি বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এ ধরনের হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি কোম্পানি, বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন প্রযুক্তি ও বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের হুঁশিয়ারি

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে নতুন প্রযুক্তি ও বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা হবে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, ইরানের ঘোষিত সাতটি শর্ত পূরণ না হলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ সহজ হবে না। এসব শর্ত পূরণ করা হলে তবেই আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে সাতটি শর্তের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই বাড়ছে উত্তেজনা

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাতারের মধ্যস্থতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে আলোচনার উদ্যোগের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কঠোর সামরিক বার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব শুধু ইরানের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনাও পাল্টা হামলার আওতায় আসতে পারে।

এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, সামরিক হুঁশিয়ারির এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাতের দিকে যাবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের পথ তৈরি হবে। ইরানের বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত থাকলেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পদক্ষেপের ওপর।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!