ইউরোপ ও আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ধরে রাখতে পণ্যের উৎপাদন, কাঁচামালের উৎস, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরবরাহব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ বা ট্রেসেবিলিটি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রম অধিকারসংক্রান্ত বিধিবিধান কঠোর হওয়ায় এ ক্ষেত্রে ঘাটতি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান চারটি রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ির সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে ৬৬টি তথ্যগত ও কাঠামোগত ঘাটতি চিহ্নিত করেছে সরকার। এর মধ্যে ৩৯টিকে অগ্রাধিকারযোগ্য বা গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশলপত্র প্রণয়ন এবং একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গঠনসহ ছয় দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সভায় সরকারি-বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশীয় বাজারেও পণ্যের উৎস, মান ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
ট্রেসেবিলিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ট্রেসেবিলিটি বা পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্যতা হলো কোনো পণ্য কোথায়, কীভাবে, কোন উপকরণ দিয়ে এবং সরবরাহব্যবস্থার কোন কোন ধাপ অতিক্রম করে উৎপাদিত ও বাজারজাত হয়েছে, তার তথ্য শনাক্ত ও যাচাই করার ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং চূড়ান্ত ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যের যাত্রাপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ, ক্রেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন শুধু পণ্যের দাম ও মান নয়, উৎপাদনের পরিবেশ, শ্রমিকদের অধিকার, কাঁচামালের উৎস এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও তথ্য চাইছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের উৎস এবং সরবরাহব্যবস্থার তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত যাচাই, পণ্য ছাড়ে বিলম্ব, ক্রেতার আস্থা হারানো কিংবা বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য খাতের মতো রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য তাই ট্রেসেবিলিটি এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
আন্তর্জাতিক বিধিবিধানে বাড়ছে চাপ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বা ডিপিপি, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যসংক্রান্ত বিধিবিধান, মৎস্য খাতে ডিজিটাল সার্টিফিকেশন এবং বন উজাড়সংক্রান্ত নিয়মকানুন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন প্রস্তুতির প্রয়োজন তৈরি করছে।
ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পণ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে কোন পণ্যের জন্য কখন এবং কী ধরনের তথ্য বাধ্যতামূলক হবে, তা সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় বিধিমালা ও বাস্তবায়নসূচির ওপর নির্ভর করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সময়সূচি অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৭ সালের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট এবং একই বছরের ডিসেম্বরে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত বিধিবিধান কার্যকরের বিষয়টি সামনে রয়েছে। এ ছাড়া ইইউর মৎস্যপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে চালু হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বন উজাড়সংক্রান্ত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ৩০ ডিসেম্বরের সময়সীমাও তুলে ধরা হয়েছে।
চামড়া খাতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আওতায় ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কসাইখানা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের উৎস অনুসরণের ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এসব বিধিবিধানের কার্যকর হওয়ার তারিখ, সংশোধিত সময়সীমা, পণ্যভিত্তিক প্রযোজ্যতা ও বাধ্যবাধকতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি। কারণ, বিধির ধরন ও পণ্যভেদে বাস্তবায়নের শর্ত আলাদা হতে পারে।
চার খাতে ৬৬টি ঘাটতি চিহ্নিত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সাসটেইনেবল ইন দ্য টেক্সটাইল সেক্টর (এসটিআইএলই-II) প্রকল্পের আওতায় একটি সমন্বিত গ্যাপ অ্যানালাইসিস বা ঘাটতি মূল্যায়ন সমীক্ষা পরিচালিত হয়।
সমীক্ষায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ি খাতের সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনা করে মোট ৬৬টি ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়। ক্রিটিক্যাল প্রেফারেন্স স্কোরিং (সিপিএস) পদ্ধতি ব্যবহার করে এর মধ্যে ৩৯টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হয়।
সমীক্ষার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, এসব ঘাটতির মধ্যে—
১৮টি আশু সংকট: আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সমাধানের প্রয়োজন।
১৩টি কাঠামোগত সংকট: ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে সমাধানের লক্ষ্য।
৮টি কৌশলগত সংকট: ৩৬ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে সমাধানের পরিকল্পনা।
সমীক্ষায় ঘাটতিগুলোকে বিভিন্ন ক্ষেত্রেও ভাগ করা হয়েছে। কারিগরি ও ডেটা ব্যবস্থাপনায় ১৪টি ঘাটতি পাওয়া গেছে, যার পাঁচটি অগ্রাধিকারযোগ্য। নীতি ও প্রবিধানসংক্রান্ত ক্ষেত্রে ১৪টি ঘাটতি রয়েছে, যার চারটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সুশাসনে ১২টি, খাতভিত্তিক কাঠামোয় ৯টি, শিল্পের সক্ষমতায় আটটি এবং অর্থায়নসংক্রান্ত ক্ষেত্রে সাতটি ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তির অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, নীতিমালার সামঞ্জস্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং অর্থায়নের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য আছে, কিন্তু সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল
সমীক্ষায় উঠে আসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য একেবারেই নেই—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, কাস্টমস ব্যবস্থা ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ এবং বিনিময়ের উপযোগী অভিন্ন ব্যবস্থা নেই।
ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য অন্য সংস্থা বা ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিকারকের কাছে থাকা কাঁচামালের উৎসসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তথ্যের তাৎক্ষণিক সংযোগ না থাকলে পণ্যের পুরো সরবরাহব্যবস্থা যাচাই করতে সময় লাগে।
তৈরি পোশাক খাতে তুলার উৎস শনাক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্টের (ইউএফএলপিএ) আওতায় নির্দিষ্ট অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। পোশাকে ব্যবহৃত তুলার উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে রপ্তানিকারকদের পণ্যের উৎস প্রমাণ করতে জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
এ ছাড়া দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিন্ন ডেটা মানদণ্ড, নির্ভরযোগ্য যাচাইব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উরমি গ্রুপ, এপিলিয়ন ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। চামড়া ও চিংড়ি খাতেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরীক্ষামূলক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের জন্য এখনো জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত পদ্ধতি বা তথ্য অন্য প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে সংযুক্ত করা সম্ভব হয় না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিভিন্ন খাতের বিদ্যমান উদ্যোগকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্মে তথ্য যাচাই, পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সুবিধা রাখার কথা রয়েছে।
এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম চালু হলে উৎপাদক, রপ্তানিকারক, সরকারি সংস্থা, ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মধ্যে তথ্যের সামঞ্জস্য বাড়তে পারে। তবে প্ল্যাটফর্মটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার ওপর।
তৈরি পোশাক খাতের প্রস্তুতি কতটা
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান জানান, পোশাক খাতকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্টসহ বিভিন্ন পরিবেশগত, সামাজিক ও সরবরাহব্যবস্থাসংক্রান্ত নীতিমালার জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জিআইজেডের সহায়তায় ৩০০টির বেশি কারখানায় পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড (ইএসজি) এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে।
তাঁর মতে, বিভিন্ন ক্রেতার আলাদা আলাদা চাহিদা অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা চালুর পরিবর্তে পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ও মানসম্মত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
চামড়া ও জুতা খাতেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহায়তায় ২০টি কারখানায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ খাতে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় আরবিসি সেল এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ের কাঠামো তৈরিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ব্যয় বহনের সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে সরকারের ছয় দফা সিদ্ধান্ত
চিহ্নিত ৬৬টি ঘাটতি দূর করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন শর্ত পূরণের প্রস্তুতি জোরদার করতে সভায় ছয়টি মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের দায়িত্ব নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
১. জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশলপত্র চূড়ান্ত
সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, তথ্যের মানদণ্ড এবং সমন্বয়ের কাঠামো নির্ধারণ করে দ্রুত একটি জাতীয় কৌশলপত্র চূড়ান্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জিআইজেড ও বিল্ডকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে।
২. জাতীয় ট্রেসেবিলিটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন
সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় ট্রেসেবিলিটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সমন্বয়, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
৩. সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), জিআইজেড ও বিল্ডের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তঃকার্যক্ষম জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম (এনটিপি) তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি, তথ্য যাচাই এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
৪. সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ
ট্রেসেবিলিটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সচেতন করতে সংলাপ, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আন্তর্জাতিক বিধিবিধান সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো হবে এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
৫. বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সমন্বয়
বিভিন্ন সমিতি, প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীর পরিচালিত পৃথক ট্রেসেবিলিটি উদ্যোগ, সমীক্ষা ও পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি কমানো এবং বিদ্যমান অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
৬. পলিসি কো-অর্ডিনেশন ইউনিট স্থানান্তর
দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা ও ট্রেসেবিলিটিসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য গঠিত পলিসি কো-অর্ডিনেশন ইউনিটকে (পিসিইউ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগ থেকে রপ্তানি অনুবিভাগে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রপ্তানি খাতের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে নীতি সমন্বয়ের সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে।
রপ্তানি ট্রেসেবিলিটিকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ
বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ২০২৫ সাল থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জিআইজেডের সঙ্গে বিল্ড ট্রেসেবিলিটি নিয়ে কাজ করছে।
তিনি মনে করেন, দেশীয় বাজারে ট্রেসেবিলিটির গুরুত্ব থাকলেও প্রথম ধাপে রপ্তানি ট্রেসেবিলিটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু এবং জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম গঠন জরুরি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রপ্তানি খাতের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হলে শুধু একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, রপ্তানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।
অভ্যন্তরীণ বাজারেও কাজে লাগবে ট্রেসেবিলিটি
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার অবিচল। তাঁর মতে, ট্রেসেবিলিটির প্রয়োজনীয়তা শুধু রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানেও এ ব্যবস্থা কাজে লাগানো যেতে পারে।
কোনো পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থার কোন ধাপে তার ব্যয় বেড়েছে—এসব তথ্য পাওয়া গেলে বাজার পর্যবেক্ষণ ও অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে কৃষি-খাদ্য ও মৎস্য খাতে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।
তবে এ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ, নির্ভরযোগ্য যাচাইব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ
ট্রেসেবিলিটি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কৌশলপত্র, স্টিয়ারিং কমিটি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গঠনের পরিকল্পনা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত পূরণ নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ঘাটতিগুলো সমাধান, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তি গ্রহণের ব্যয়, তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোন সংস্থা কোন তথ্য সংরক্ষণ করবে, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কীভাবে যাচাই হবে, কে তথ্য ব্যবহার করতে পারবে এবং তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ও জাতীয় কাঠামোয় স্পষ্ট করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত ছয় দফা সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষা, ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি এবং পণ্যের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও খাদ্যপণ্যের মান, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।

