ঢাকা রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

menu

ছেলের এইচএসসি ফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাবা, বেঁচে নেই রোজান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১০:০১ এএম

ছেলের এইচএসসি ফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাবা, বেঁচে নেই রোজান

ছবিঃ সংগৃহীত

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশার। কিন্তু মিনহাজুল ইসলাম রোজানের পরিবারের কাছে দিনটি ফিরে এসেছে গভীর শোক আর না-পাওয়ার বেদনা নিয়ে। যে ছেলের ফলাফল দেখে আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল মা-বাবার, সেই ছেলেই আজ নেই। পরীক্ষার ফল দেখার সুযোগও হয়নি তাঁর। জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রোজান।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ছেলের ফলাফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, জীববিজ্ঞান ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে জিপিএ ৪.৩৩ পেয়েছেন রোজান। তবে জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় ওই বিষয়ে তাঁকে অকৃতকার্য দেখানো হয়েছে।

রোজান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের আশা ছিল, ভালো ফল করে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই চলে গেছেন রোজান। তাঁর ফলাফল এখন পরিবারের কাছে যেমন সম্ভাবনার স্মারক, তেমনি গভীর বেদনারও কারণ।

ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে অসুস্থ, ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট এইচএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রোজান। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে টানা ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকতে হয় তাঁকে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

অসুস্থতার কারণে জীববিজ্ঞানসহ দুটি ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি তিনি। ফলে পরীক্ষার ফলাফলে তার প্রভাব পড়ে। যে শিক্ষার্থীকে ঘিরে পরিবারের ছিল ভালো ফলের প্রত্যাশা, তাঁর ফলাফল দেখতে হলো শোকাহত মা-বাবাকে।

ছেলের ফলাফল প্রকাশের দিন বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ প্রথম আলোকে বলেন, “ছেলের ফলাফল বের হয়েছে। আজ ওর কথা খুব মনে পড়ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে ও দুটি ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পরীক্ষা দিতে পারলে ওর ফলাফল আরও ভালো হতো।”

স্কুলের এক শিক্ষক রোজানের ফলাফলের কাগজ তাঁর বাবার কাছে পাঠান। সেই ফলাফল দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সাজ্জাদুল মিরাজ।

তিনি জানান, চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে রোজানের ফল জিপিএ ৪.৩৩ হয়েছে। জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলে এবং ওই বিষয়ে এ প্লাস পেলে তাঁর চূড়ান্ত জিপিএ ৪.৮৩ হতে পারত বলে পরিবারের ধারণা।

ছেলের অসুস্থতা নিয়ে আক্ষেপ মা-বাবার

রোজানের অসুস্থতা ও মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর আক্ষেপ রয়েছে তাঁর মা-বাবার। সাজ্জাদুল মিরাজ ও তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার জানান, ছেলের ডায়াবেটিস ছিল, তা তাঁরা আগে জানতেন না। পরীক্ষার চাপের পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে না পারায় এখন নানা প্রশ্ন তাঁদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রোজানকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, চিকিৎসকদের কেউ পরীক্ষার চাপ নিয়ে দুশ্চিন্তা, কেউ প্যানিক অ্যাটাকের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। আবার কেউ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন।

পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি। তাঁদের ভাষ্য, রোজানকে স্যালাইন ও ঘুমের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছিল। তবে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মূল্যায়ন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার পর জানা যায় ডায়াবেটিসের কথা

পরিবার জানিয়েছে, ১৩ আগস্ট রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় রোজানের রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে বেড়ে যায়। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেদিন তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা ৩৮ মিলিমোল/লিটারে পৌঁছায়। তখনই প্রথম ছেলের ডায়াবেটিসের কথা জানতে পারেন মা-বাবা।

এই ঘটনা তাঁদের কাছে ছিল বড় ধাক্কা। ছেলের অসুস্থতার প্রকৃত কারণ আগে জানা গেলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত কি না—এমন আক্ষেপও তাঁদের মনে রয়েছে। তবে চিকিৎসার নথি ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ছাড়া তাঁর অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

রোজানের মৃত্যুর পর তাঁর পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ায় পরিবারের শোক আরও গভীর হয়েছে। ফলাফলে যে নম্বর ও গ্রেড দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে অসমাপ্ত পরীক্ষা, হাসপাতালের দিনগুলো এবং একজন শিক্ষার্থীর অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প।

পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্বেও ছিলেন এগিয়ে

রোজানের পরিবার জানায়, তিনি শুধু পড়াশোনাতেই নয়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও ছিলেন সক্রিয়। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

অমায়িক ব্যবহার ও দায়িত্বশীলতার কারণে শিক্ষকদের আস্থা অর্জন করেছিলেন রোজান। সহপাঠীদের কাছেও ছিলেন প্রিয়। পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সঙ্গে। শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর এমন সম্পৃক্ততা ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের প্রত্যাশা আরও বাড়িয়েছিল।

পরিবারের সদস্যদের কাছে রোজান ছিলেন শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; ছিলেন ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর অনুপস্থিতিতে ঘরের প্রতিটি স্মৃতি এখন বেদনার কারণ হয়ে উঠেছে।

ফলাফল প্রকাশের দিনে অপূর্ণ স্বপ্নের স্মৃতি

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সাধারণত শিক্ষার্থী ও পরিবারের মধ্যে আনন্দ, উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু রোজানের পরিবারের জন্য দিনটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে নতুন করে মনে করার দিন।

জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় একটি বিষয়ে অকৃতকার্য দেখানো হলেও তাঁর জীবনের গল্প কেবল ফলাফলের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন, শিক্ষকদের আস্থা অর্জন এবং বিএনসিসির সঙ্গে যুক্ত থাকার স্মৃতি পরিবারের কাছে থেকে যাবে।

রোজানের মৃত্যুর পর তাঁর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেই ফল নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে বসে কথা বলা, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা কিংবা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ আর নেই। ছেলের ফলাফলের কাগজ হাতে নিয়ে বাবা সাজ্জাদুল মিরাজের কান্না যেন সেই অপূর্ণতারই প্রতিচ্ছবি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!