রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি আজ রোববার (১ নভেম্বর)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে শুনানিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গঠনের বিষয়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার পথ তৈরি হবে।
এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন; বাকিরা পলাতক। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে এর আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
৫ মে শাপলা চত্বরে কী ঘটেছিল
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির ১৩ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে ওই সমাবেশ ঘিরে রাজধানীতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাতভর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
শাপলা চত্বরের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই হতাহতের সংখ্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। হেফাজতে ইসলাম ও বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাটির বিচার দাবি ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা।
তদন্তে ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা শাপলা চত্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে। তদন্তে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে মোট ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
তদন্তের ভিত্তিতে ৪১ জনকে অভিযুক্ত করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
তবে মামলার অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা দায়ের চূড়ান্ত বিচারিক মূল্যায়ন এখনো বাকি। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং উভয় পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।
আগের শুনানি পিছিয়ে যায়
এর আগে গত ৭ অক্টোবর মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারক অসুস্থ থাকায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সময় চেয়ে আবেদন করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের শুনানি মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ পর্যায়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অভিযোগ গঠন করা হলে মামলার বিচার শুরু করার আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি হবে। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা এ মামলার শুনানির দিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদেরও নজর রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজকের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত দেন, তার ওপর নির্ভর করছে মামলার পরবর্তী বিচারিক অগ্রগতি।

