দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলে প্রবেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ঝুঁকি বাড়ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (১ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। অনেক দল নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে না, বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না এবং দলীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় অংশ পরিচালিত হয় অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর প্রক্রিয়ায়।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় সদস্যপদ বা গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ ঠেকাতে অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে কার্যকর শর্ত নেই। অন্যদিকে, দলীয় প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনে জয়লাভ এবং আর্থিক সক্ষমতার কারণে অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
১৬টি দল নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন করে না
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৬টি রাজনৈতিক দল নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে না। এর মধ্যে বিএনপি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় সম্মেলন করেনি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্ব নির্বাচন, কমিটি পুনর্গঠন এবং তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দীর্ঘ সময় সম্মেলন না হওয়া এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করছে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দলগুলোর গঠনতন্ত্রে নেতৃত্ব নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নির্ধারণে সাধারণ সদস্যদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।
অপরাধীদের রাজনীতিতে প্রবেশ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৮টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার কোনো শর্ত উল্লেখ নেই। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় সদস্যপদ বা গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যয় নির্বাহ, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো কারণে রাজনৈতিক দলগুলো অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি আগ্রহী হয়। অন্যদিকে, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের সুরক্ষা এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে চাঁদাবাজি, মানবপাচার, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের প্রবেশের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বা একাধিক মামলা ছিল। এ তথ্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং প্রার্থীদের নৈতিক যোগ্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দলীয় অর্থায়নে স্বচ্ছতার অভাব, নেই বার্ষিক বাজেট
রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে টিআইবি। গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো দলেরই সুস্পষ্ট আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি নেই। দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। তাদের আয়-ব্যয়ের বড় অংশ কর্মসূচিভিত্তিক এবং অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়।
দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সদস্যদের চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, অর্থ লেনদেন, ফরম বিক্রির আয়, ব্যয়ের হিসাব, নিরীক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়, তার সঙ্গে বাস্তব আর্থিক কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্য ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
টিআইবির মতে, রাজনৈতিক দল পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও অর্থের উৎস, সংগ্রহ, ব্যয় এবং নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ পরিস্থিতি রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।
নির্বাচনী ব্যয়ে নির্ধারিত সীমা ছাড়ানোর অভিযোগ
নির্বাচনী ব্যয় এবং প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ, ঋণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও বিদেশি নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য গোপন করা কিংবা ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। একই সঙ্গে দলগুলোর গঠনতন্ত্রে মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের পরিকল্পনা, অর্থের উৎস, ব্যয় তদারকি এবং আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ধারিত ব্যয়সীমার তুলনায় প্রার্থীরা গড়ে ১৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছেন। এত বেশি ব্যয়ের পরও দলগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান লঙ্ঘন করলেও দলগুলোর গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান নেই।
দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সীমিত
টিআইবির গবেষণায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও দলগুলোর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে লঘু দণ্ড দিয়েই দায় শেষ করা হয়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের ভেতরে অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই, তদন্ত এবং শাস্তির জন্য কার্যকর ও স্বাধীন ব্যবস্থা না থাকায় জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এতে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মের সুযোগ বাড়তে পারে।
৩২ দলের মধ্যে সক্রিয় ওয়েবসাইট মাত্র ১৬টির
রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্য প্রকাশ ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৪টির ওয়েবসাইট থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১৬টির। ফলে দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতৃত্ব, আয়-ব্যয়, নীতিগত অবস্থান এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
গবেষণায় বলা হয়েছে, তথ্যপ্রকাশের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক দলের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে দলগুলোর অনীহা রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনি বাধ্যবাধকতা ও দলীয় অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও নারীদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অনেক দল কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। কোথাও কোথাও দলীয় কার্যক্রমে নারীদের উপস্থিতি নামমাত্র বা প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দলীয় কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং নারী কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির কারণে একক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অভিজাততন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিকতা আরও গভীর হচ্ছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের যোগসূত্র
গবেষণায় রাজনৈতিক অর্থায়নের অনানুষ্ঠানিকতা এবং ব্যক্তিনির্ভরতার প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে।
অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও দলীয় অবস্থান ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ অর্জনের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
টিআইবির মতে, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।
৪২টি দলের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য দিয়েছে ৩২টি
টিআইবির গবেষণাটি গুণগত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ—উভয় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
এ জন্য মোট ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত এবং পাঁচটি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। তবে তথ্য পাওয়া গেছে ৩২টি দলের কাছ থেকে। বাকি ১০টি দলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়নি।
গবেষণায় তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সময়ক্ষেপণ, অসহযোগিতা এবং আংশিক তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
রাজনৈতিক দল সংস্কার ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না: ইফতেখারুজ্জামান
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাস ও অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের দায়ও তাদের রয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না, যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সুশাসন নিশ্চিত না হয়। সাধারণত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। অথচ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং তাদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়েই এ গবেষণা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে গবেষণার কাজ শুরু হলেও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দলের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতার চ্যালেঞ্জসহ নানা কারণে প্রতিবেদনটি সম্পন্ন করতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লেগেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় সংস্কারের বার্তা
টিআইবির গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইন ও বিধিমালা থাকলেও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গবেষণার তথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। নিয়মিত সম্মেলন আয়োজন, স্বচ্ছ নেতৃত্ব নির্বাচন, আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় পদে আসীন হওয়া ঠেকানো, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নির্বাচনী ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুশাসন ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে—টিআইবির গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।

