সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশার চলাচল নিয়মের আওতায় আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। ‘ই-রিকশা চলাচল বিধিমালা ২০২৬’ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশায় তৈরি ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তি একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলসংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন নীতিমালার আওতায় ই-রিকশার নিবন্ধন, নকশা, গতিসীমা, যাত্রী পরিবহন, চলাচলের এলাকা এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এসব নিয়ম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়কে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বুয়েট অনুমোদিত নকশা ছাড়া চলবে না ই-রিকশা
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলের জন্য ই-রিকশার বডি ও কাঠামোর নকশা বুয়েটের অনুমোদিত হতে হবে। বুয়েটের নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করে তৈরি নয়—এমন কোনো ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি পাবে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সড়কে চলাচলরত ই-রিকশাগুলোর নিবন্ধন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চলাচলরত এসব ই-রিকশা মূলত অবৈধ। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে নিবন্ধন ও অনুমোদনের মাধ্যমে যানবাহনগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশন চাইলে নতুন নিয়ম অনুযায়ী আগামীকাল থেকেই ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। তবে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত নকশা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
নিবন্ধন ফি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা
নীতিমালায় ই-রিকশার ধরন ও যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা অনুযায়ী নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। চারজন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা। অন্য ক্যাটাগরির ই-রিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে আট থেকে ১০ হাজার টাকা।
নিবন্ধনের পর চালকদের প্রতিবছর তা নবায়ন করতে হবে। এভাবে নিবন্ধন নবায়ন করে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত ই-রিকশা চালানো যাবে।
এ ছাড়া একজন ব্যক্তি একটি এনআইডি ব্যবহার করে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন। এর মাধ্যমে নিবন্ধনের সংখ্যা ও মালিকানা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একই ব্যক্তির নামে অতিরিক্তসংখ্যক যানবাহন নিবন্ধন ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার
সড়কে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা কমাতে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধিত ও অনুমোদিত নকশার ই-রিকশাগুলোকে এই গতিসীমা মেনে চলতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশায় দুই থেকে চারজনের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। অর্থাৎ, নির্ধারিত আসনসংখ্যার বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সুযোগ থাকবে না।
সড়কে যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে গতিসীমা ও যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
ঢাকায় আট জোনে চলবে ভিন্ন রঙের রিকশা
ঢাকা মহানগরীতে ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে পুরো এলাকাকে আটটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জোনের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত রঙের মাধ্যমে কোন ই-রিকশা কোন এলাকায় চলাচলের অনুমতি পেয়েছে, তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জোনভিত্তিক এই ব্যবস্থার ফলে ই-রিকশার চলাচল নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং এক এলাকার যানবাহনের অন্য এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি নিবন্ধিত যানবাহন শনাক্ত ও নজরদারির ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে।
ব্যাটারি চার্জে নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্দেশনা
নতুন নীতিমালায় ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যাটারি চার্জের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অবৈধভাবে ব্যাটারি চার্জ করা হলে শাস্তির বিধান থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে চার্জিং কার্যক্রমকে নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নীতিমালার কোনো শর্ত লঙ্ঘন করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
চালকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান
নতুন নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ কারণে বর্তমানে ই-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা চালকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় চালকদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাস্তবায়নই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ
ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিটি করপোরেশন এলাকায় যানবাহন নিবন্ধন, চলাচলের অনুমতি, গতিসীমা ও যাত্রী পরিবহনে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে। তবে নীতিমালার সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকির ওপর।
বিশেষ করে বুয়েট অনুমোদিত নকশায় ই-রিকশা তৈরি, নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা, আটটি জোনে চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ের নিয়ম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ই-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা চালকদের নিবন্ধনের সুযোগ, আর্থিক সক্ষমতা এবং নতুন নিয়মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বিধিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

