ঢাকা রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

menu

‘আর মাত্র পাঁচ বছর বাঁচব বলেছিলেন চিকিৎসক’, লাইফ সাপোর্ট পেরিয়ে শুটিংয়ে তানিয়া বৃষ্টি

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

‘আর মাত্র পাঁচ বছর বাঁচব বলেছিলেন চিকিৎসক’, লাইফ সাপোর্ট পেরিয়ে শুটিংয়ে তানিয়া বৃষ্টি

ছবিঃ সংগৃহীত

মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত, একাধিক অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি, লাইফ সাপোর্ট—জীবনের কঠিন এক অধ্যায় পার করেছেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস চিকিৎসা ও অভিনয় থেকে দূরে থাকার পর আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর শুটিংয়ে ফিরতে পারাকে নিজের কাছে ‘দ্বিতীয় জন্ম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এই অভিনেত্রী।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অসুস্থতা, চিকিৎসার অভিজ্ঞতা, মৃত্যুর আশঙ্কা এবং অভিনয়ে ফেরার গল্প তুলে ধরেন তানিয়া বৃষ্টি। তিনি জানান, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আগের তুলনায় এখন অনেকটাই ভালো আছেন। স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করতে পারছেন, হালকা ব্যায়াম করছেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে এখনো চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।

শুটিংয়ে ফিরলেন ‘অংশীদার’ নাটক দিয়ে

দীর্ঘ প্রায় ১০ মাসের বিরতির পর ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে ফিরেছেন তানিয়া বৃষ্টি। নাটকটিতে ‘সুমি’ চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি।

নাটকের গল্পে বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে চাচার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে সুমি। এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই আবারও অভিনয়ের জগতে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন অভিনেত্রী।

তানিয়া জানান, দীর্ঘদিন শুটিং থেকে দূরে থাকায় কাজের পরিবেশ, সহকর্মী ও পুরো নাট্যাঙ্গনকে খুব মিস করছিলেন। তাঁর কাছে সহকর্মীরা পরিবারের সদস্যদের মতো। তাই আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পেরে মানসিকভাবে স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করছেন।

প্রথম দিনের শুটিংয়ে পরিচালক, ক্যামেরাম্যান ও প্রযোজনা দলের সদস্যরা তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সহযোগিতা করেছেন। কাজের চাপ যেন শরীরের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও সতর্ক ছিলেন তাঁরা।

এখনো চলছে কেমোথেরাপি

অভিনয়ে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি তানিয়া বৃষ্টি। চলমান কেমোথেরাপির কারণে শুটিং করলে শারীরিক জটিলতা বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় চিকিৎসকেরা শুরুতে তাঁকে কাজে ফেরার অনুমতি দিতে চাননি।

পরে অভিনেত্রীর অনুরোধের পর একটি নাটকে অভিনয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁর এখনো দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি রয়েছে। চিকিৎসা শেষ হলে এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের টিউমারের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা হবে।

অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মাথার ডান পাশের সমস্যার কারণে বাঁ দিকে কাত হয়ে ঘুমাতে পারতেন না। প্রচণ্ড দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং নিয়মিত বমির সমস্যাও ছিল। রেডিওথেরাপির ধাপ শেষ করে এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।

শুটিংয়ের সেটেই শুরু অসুস্থতা

তানিয়া বৃষ্টির অসুস্থতার শুরু গত বছরের ডিসেম্বরে। একটি নাটকের শুটিং চলাকালে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয় তাঁর। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও টানা চার দিন শুটিং চালিয়ে যান। কিন্তু পঞ্চম দিনে বমির সমস্যা বেড়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরদিন বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদনে মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত হয়। হঠাৎ এমন খবর পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

প্রথমদিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভারতের চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালের একজন অনকোলজিস্ট তাঁকে জানান, তাঁর আয়ু হয়তো আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর হতে পারে। চিকিৎসকের এমন বক্তব্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

একাধিক অস্ত্রোপচার, একপর্যায়ে লাইফ সাপোর্ট

চিকিৎসার অংশ হিসেবে একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তানিয়া বৃষ্টিকে। প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের সঙ্গে অনেকটা বিদায়ের মতো করে কথা বলেছিলেন তিনি। পরিস্থিতি কতটা জটিল হতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকেই এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলে জানান অভিনেত্রী।

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। জ্ঞান ফেরার পর আইসিইউর পরিবেশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে পাশে মা ও বোনকে দেখতে পেয়ে সাহস ফিরে পান।

অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থতার পুরো সময়ে মায়ের সেবা, পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা ও প্রার্থনা তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। চিকিৎসার কঠিন ধাপগুলো পার করতে পরিবারের সমর্থন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা।

পাশে ছিলেন সহকর্মীরাও

অসুস্থতার সময় শুধু পরিবার নয়, নাট্যাঙ্গনের অনেক সহকর্মীও নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন। অভিনেতা মোশাররফ করিম, নিলয় এবং প্রযোজক আলী বশীরসহ অনেকে তাঁর পাশে ছিলেন।

তবে অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ায় স্বজন, সহকর্মী ও ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই কঠিন সময় পেছনে ফেলে এখন নতুন করে জীবন ও ক্যারিয়ার সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন তানিয়া।

২০১২ সালে অভিনয়ে যাত্রা শুরু

ভালোবাসা থেকেই ২০১২ সালে অভিনয়জগতে পা রাখেন তানিয়া বৃষ্টি। সময়ের সঙ্গে ছোট পর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান এই অভিনেত্রী।

দীর্ঘ বিরতির পর আবারও অভিনয়ে ফিরতে পেরে আনন্দিত তিনি। অসুস্থতার কারণে থমকে যাওয়া কর্মজীবন নতুন করে শুরু করার সুযোগকে নিজের কাছে নতুন জীবনের মতো মনে করছেন।

কঠিন রোগে আক্রান্তদের জন্য তানিয়ার বার্তা

ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তানিয়া বৃষ্টি বলেছেন, রোগের নাম শুনেই যেন কেউ মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন। মনোবল ধরে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো জরুরি।

তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, দীর্ঘ ও কঠিন চিকিৎসার সময় পরিবারের সমর্থন এবং মানসিক শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও নির্ধারিত চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে জরুরি।

মস্তিষ্কের টিউমার শনাক্ত হওয়ার পর অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও লাইফ সাপোর্টের মতো কঠিন অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তানিয়া বৃষ্টির এই প্রত্যাবর্তন তাঁর ভক্তদের জন্য স্বস্তির খবর। চিকিৎসা এখনো শেষ না হলেও অভিনয়ে ফেরার মধ্য দিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নিজের ভাষায়, ক্যামেরার সামনে ফিরে আসা যেন তাঁর ‘দ্বিতীয় জন্ম’।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!