ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, টিকাদানে ঘাটতি ও তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতায় বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:০৫ এএম

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, টিকাদানে ঘাটতি ও তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতায় বাড়ছে উদ্বেগ

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। টিকাদানের হার কমে যাওয়া, লাখ লাখ শিশুর তথ্য তালিকার বাইরে থাকা, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হামের দুই লাখের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে ২২ হাজারের বেশি রোগীর সংক্রমণ। একই সময়ে হামে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হামের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি। টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের অসংগতি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি প্রাদুর্ভাব মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে দরিদ্র, দুর্গম ও স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকাদানের হার বজায় রাখা না গেলে অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিরই বড় উদাহরণ।

৯ অক্টোবর পর্যন্ত দুই লাখের বেশি সন্দেহভাজন রোগী

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের দুই লাখ দুই হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২ হাজারের শরীরে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, এ সময়ে হামে এক হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি-হাঁচি ও শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে অন্য ব্যক্তিও সংক্রমিত হতে পারেন। এ রোগে সাধারণত উচ্চ জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ফুসকুড়ি দেখা দেয়। জটিলতা তৈরি হলে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

ডব্লিউএইচওর সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার হাম আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে। তবে অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুহার আরও বেশি হতে পারে।

টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

হাম নিয়ন্ত্রণে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকার আওতায় আনার সুপারিশ করে ডব্লিউএইচও। এর উদ্দেশ্য হলো ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা এবং টিকা না পাওয়া বা টিকা নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত সুরক্ষা তৈরি না হওয়া ব্যক্তিদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।

একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ছিল ৯৩ শতাংশ।

কিন্তু ২০২৫ সালে এ হার কমে যায়। ওই বছরের জন্য প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ডোজ নেওয়ার হার নেমে আসে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে। ফলে হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের এই ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকলে টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়ে। ফলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একটি এলাকায় সংক্রমণ শুরু হলে পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ সুরক্ষিত না থাকায় তা দ্রুত অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তুলনায় সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব হলেও তার আগেই অনেক মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন এবং কারও কারও মৃত্যু হতে পারে।

লাখ লাখ শিশুর হিসাব নেই, জরুরি কর্মসূচিতেও ঘাটতি

রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে কত শিশু টিকার আওতায় এসেছে এবং প্রকৃতপক্ষে কত শিশু বাদ পড়েছে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসংগতি দেখা গেছে।

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করে। সরকার জানিয়েছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যমাত্রার সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী তথ্য সেই দাবির সঙ্গে অসংগতি নির্দেশ করে।

জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার তালিকায় একই বয়সসীমার শিশুদের সংখ্যা জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচির তালিকার তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ বেশি ছিল। এতে জরুরি কর্মসূচির আওতায় কত শিশু বাদ পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার ১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি ঘাটতি রয়েছে। সে সময় হামে আক্রান্তের সংখ্যা আবার বাড়ছিল। তিনি অভিভাবকদের অনীহা এবং শিশুদের অসুস্থতার কারণে টিকা নিতে না আসার মতো বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিভাবকদের অনীহাকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদানসেবা পৌঁছানো, শিশুদের সঠিক তালিকা তৈরি, নিয়মিত প্রচার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে বৈঠকের নথিতে উদ্বেগ

রয়টার্স বাংলাদেশের সরকার, ডব্লিউএইচও ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার বৈঠকের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল ও আগস্টে অনুষ্ঠিত বৈঠকের নথিতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে।

১৯ এপ্রিলের একটি বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি কর্মসূচি শুরুর আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়েছিল। টিকা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণব্যবস্থা, কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রস্তুতি—এ ধরনের বিষয় যাচাইয়ের অংশ ছিল।

নথিতে বলা হয়, প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখা গিয়েছিল, বেশির ভাগ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।

জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান শুরু করা প্রয়োজন হলেও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে অনেক শিশু বাদ পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং যেসব এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেসব স্থানে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে ওঠে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগস্টের বৈঠকে জরুরি কর্মসূচির পরও টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না পাওয়া শিশুর অনুপাত কর্মসূচির আগে ৮২ শতাংশ এবং পরে ৮৫ শতাংশ ছিল বলে বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, জরুরি কর্মসূচির পরও টিকাদানের ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা করতে হলে নমুনার ধরন, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট শিশুদের টিকাদানের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে

বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রস্তুতি যাচাই যথাযথ না হলে প্রায়ই সবচেয়ে দরিদ্র এবং দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা টিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তাদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে সিলেট অঞ্চলের কয়েকটি পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে টিকা না পাওয়া শিশুদের হামে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

সিলেটের প্রত্যন্ত এলাকায় দুই বছর বয়সী আরমান হোসেনের মৃত্যু হয় গত জুলাইয়ে। তার বাবা আমিন মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারটিকে তাদের তিন চাকার অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছিল। আরমানের চার বছর বয়সী বোনও টিকা পায়নি, যদিও সে বেঁচে যায়।

আমিন মিয়া রয়টার্সকে বলেন, তাঁদের প্রত্যন্ত গ্রামে সময়মতো টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। ছেলেকে দাফন করার পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে এসেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সিলেটের ছাতক এলাকায় নয় মাস বয়সী লাবিবা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তার বাবা হুমায়ুন রশিদের ভাষ্য, শিশুটিকে টিকা দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, টিকাদান কর্মসূচির প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে কোনো এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী না যাওয়ার অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নথি, টিকাদান কর্মসূচির তালিকা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

টিকাদানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক বিলম্বের প্রভাব

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতার পেছনে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, টিকা কেনার আদেশ দিতে বিলম্ব এবং নিয়মিত কর্মসূচির পরবর্তী ডোজ দেওয়ার কার্যক্রমে বিঘ্নের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত না হলে শিশুদের একটি অংশ নির্ধারিত সময়ে টিকা পায় না। পরে তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে বিশেষ উদ্যোগের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঘাটতি জমতে থাকলে প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রকাশিত তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদানসংক্রান্ত সরকারি তথ্যে কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টিকা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়েছিল। এতে টিকার ডোজের হিসাব অথবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে অসংগতি থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ভুল তথ্য ছাড়া টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করা কঠিন। কোথায় কত শিশু টিকা পেয়েছে, কতজন বাদ পড়েছে এবং কোন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্য সঠিকভাবে জানা না গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।

জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ বেড়েছে

প্রাদুর্ভাবের শুরুতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সংক্রমণ কমে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে বলে মনে হয়েছিল। গত মে মাসে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন জানিয়েছিলেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ফলে সংক্রমণের হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১৯৮ জন নতুন করে হামে আক্রান্ত হন বলে জানানো হয়েছিল। মে মাসের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা।

সংক্রমণের এই পুনরুত্থান দেখিয়েছে, সাময়িকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও টিকাদানের ঘাটতি দূর করা না গেলে প্রাদুর্ভাব আবার বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আগে বাদ পড়া প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে নতুন কর্মসূচি শুরু করে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য গ্রাম পর্যায়ে সবাইকে সম্পৃক্ত করা হবে।

তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর জন্মনিবন্ধন হয় না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়। এ ছাড়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য রয়েছে।

জন্মনিবন্ধন ও নির্ভুল জনসংখ্যার তথ্য না থাকলে টিকাদানের উপযোগী শিশুর সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য থাকলে প্রত্যন্ত এলাকায় টিকা পৌঁছানো, টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা টিকাদানের তালিকা হালনাগাদ, জন্মনিবন্ধন জোরদার, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার দাবি

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এ বয়সী শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

সাধারণত হাম প্রতিরোধী টিকার নিয়মিত কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট বয়সসীমাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে কোন বয়সের কত শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে, তা পর্যালোচনা করে টিকাদানের কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্ধারিত বয়সসীমার শিশুদের টিকা দিলেই সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এ ছাড়া ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। সাধারণত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে জীবনের প্রথম দিকে কিছু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। তবে এই সুরক্ষার মাত্রা ও স্থায়িত্ব একেক শিশুর ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সভিত্তিক সংক্রমণের ধরন, টিকাদানের ইতিহাস এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে গবেষণার ফল ভবিষ্যতে টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে সাজাতে সহায়তা করতে পারে।

হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর চাপ

হামের প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর মতো অন্যান্য রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। ফলে হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর চাপ বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদকদের হাসপাতাল পরিদর্শনের দিন সেখানে ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হামের চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জটিলতার চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খেতে বা পান করতে না পারা এবং চেতনার পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসক্ষমতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত কিছু প্রশ্নের জবাব সরকার দেয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশে নিযুক্ত উপপ্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল বলেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে সহায়তা করতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদানের হার বাড়ানো, নির্ভুল তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্য পদ পূরণ, দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছানো এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

হামের মতো টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। প্রতিটি শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনতে না পারলে ভবিষ্যতেও এমন প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।

সূত্র: বার্তা সংস্থা রয়টার্স, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!