ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব মাইক্রোসফটের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব মাইক্রোসফটের

ছবিঃ সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০ হাজার কর্মী সুযোগ পেতে পারেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের বিভিন্ন বিভাগের যোগ্য কর্মীদের জন্য এ স্বেচ্ছামূলক কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে কর্মীসংখ্যা ও পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে চায়, অন্যদিকে এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও উন্নত প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে চায়।

বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোসফটও এ খাতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে। তবে এ বিনিয়োগের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে কতটা আর্থিক মুনাফা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

মাইক্রোসফটের কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে এআই এক্সপেরিয়েন্সেস, কোপাইলট, অর্থ বিভাগ, মানবসম্পদ, এক্সবক্স এবং উইন্ডোজ ও ডিভাইসেস বিভাগ।

তবে সব বিভাগের কর্মীরা এ সুযোগ পাবেন না। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিপণন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও নিরাপত্তা বিভাগের কর্মীরা এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত থাকবেন না।

মাইক্রোসফটের চিফ পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান কর্মীদের পাঠানো এক বার্তায় জানিয়েছেন, যেসব কর্মী প্রতিষ্ঠানটির বাইরে নতুন কোনো সুযোগ খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এ প্রস্তাব কর্মজীবনের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তিত প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করার সুযোগও তৈরি হবে।

তবে প্রায় ৬০ হাজার কর্মী এ প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন—এমন তথ্যকে বাস্তবে এতসংখ্যক কর্মীর চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মসূচির আওতায় যোগ্য কর্মীর সংখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত কতজন স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়বেন, তা আলাদা বিষয়।

এআই প্রযুক্তিতে কেন বিপুল বিনিয়োগ করছে মাইক্রোসফট?

বর্তমানে মাইক্রোসফটের ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআইভিত্তিক সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং, কোপাইলট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে।

এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবস্থা, উন্নত চিপ, বিপুল তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার। এসব অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় যেমন বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, তেমনি নিয়মিত বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নেও বিপুল ব্যয় হয়।

মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য তাই এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কর্মীসংখ্যা ও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগকে সেই বৃহত্তর ব্যয় ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে কর্মীসংখ্যা কমানোই এআই বিনিয়োগের একমাত্র অর্থায়নের উৎস নয়। প্রতিষ্ঠানের আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও এ ধরনের বিনিয়োগ পরিচালিত হতে পারে।

মূলধনি ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নজর

এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে মাইক্রোসফটের বিপুল ব্যয় প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজরে রয়েছে। কারণ, এআই সেবা থেকে ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য আয় আসার সম্ভাবনা থাকলেও সেই আয় কত দ্রুত বিনিয়োগের তুলনায় বাড়বে, তা এখনো বড় আলোচনার বিষয়।

প্রতিষ্ঠানটির মূলধনি ব্যয়ের মধ্যে ডেটা সেন্টার, সার্ভার, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সম্পদে বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে স্বল্পমেয়াদে নগদ অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

মাইক্রোসফটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় ও মুনাফা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং এআই খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।

আগেও কর্মী ছাঁটাই ও পুনর্গঠন করেছে মাইক্রোসফট

কর্মীসংখ্যা ও ব্যয় পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ মাইক্রোসফটের জন্য নতুন নয়। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে কর্মী ছাঁটাই, বিভাগ পুনর্গঠন এবং ব্যবসায়িক অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত যোগ্য কর্মীদের একটি অংশকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৯ হাজার কর্মী সুযোগ পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ছাঁটাই এবং এক্সবক্স গেমিং ব্যবসা পুনর্গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। গেমিং বিভাগে বিনিয়োগের কার্যকারিতা ও মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসায়িক কাঠামো পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

তবে আগের কর্মসূচি, সাধারণ কর্মী ছাঁটাই এবং নতুন স্বেচ্ছামূলক চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব এক বিষয় নয়। স্বেচ্ছামূলক কর্মসূচিতে কর্মীরা নির্ধারিত শর্তে নিজেরাই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; অন্যদিকে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কর্মসংস্থান শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

কর্মীসংখ্যা ও এআই বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য

মাইক্রোসফটের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বব্যাপী পূর্ণকালীন কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার। সেই হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার কর্মী প্রস্তাবের আওতায় আসার তথ্য সঠিক হলে, এটি প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীবাহিনীর বড় একটি অংশকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রস্তাব পাওয়ার যোগ্য কর্মীর সংখ্যা এবং প্রকৃতপক্ষে চাকরি ছেড়ে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা এক নয়। তাই কর্মসূচির চূড়ান্ত প্রভাব নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও পরবর্তী তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে কর্মী পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ব্যয় কমানো গেলেও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গ্রাহকসেবা বজায় রাখা মাইক্রোসফটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

বিনিয়োগকারীদের নজর আর্থিক ফলাফলে

মাইক্রোসফটের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের সময় প্রতিষ্ঠানটির আয়, পরিচালন ব্যয়, মূলধনি বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এআই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে মুনাফা ও নগদ প্রবাহের ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হবে।

প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ কত দ্রুত নতুন আয় তৈরি করবে এবং সেই বিনিয়োগের আর্থিক সুফল কতটা টেকসই হবে।

সব মিলিয়ে, মাইক্রোসফটের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাবকে শুধু কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ মুনাফা নিশ্চিত করার কৌশল। তবে কর্মসূচির চূড়ান্ত পরিধি ও বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!