ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে টানা তৃতীয় দিন উত্তরা অবরোধ শ্রমিকদের

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে টানা তৃতীয় দিন উত্তরা অবরোধ শ্রমিকদের

ছবিঃ সংগৃহীত

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় টানা তৃতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরা রাজলক্ষ্মী ও আজমপুর এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার এক হাজারের বেশি শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। পরে তাঁরা বিমানবন্দর সড়কের দিকে অগ্রসর হলে ওই সড়কেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন কর্মস্থলগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও অন্যান্য যাত্রীরা।

বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাঁদের বক্তব্য, চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন।

বুধবার দুপুর ১টার দিকেও শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রাজলক্ষ্মী ও আজমপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, বিমানবন্দর সড়কেও প্রভাব

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরা রাজলক্ষ্মী ও আজমপুর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।

পরে বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দর সড়কের দিকে সরে গেলে সেখানেও যান চলাচল ব্যাহত হয়। রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় আশপাশের এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

পরিস্থিতির কারণে অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা যায়। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারা এবং জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। সড়কে যানবাহন আটকে থাকায় বিকল্প পথে চলাচলের চেষ্টা করেন অনেকে।

তবে কোন কোন কারখানার শ্রমিকেরা এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।

‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাও, নয়তো মজুরি বাড়াও’

বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকদের মুখে শোনা যায়, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাও, নয়তো মজুরি বাড়াও’—এমন স্লোগান। তাঁদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিক শরিফা বেগম বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি—হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে হবে, নয়তো আমাদের মজুরি বাড়াতে হবে, যাতে আমরা জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে পারি।’

আরেক শ্রমিক বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনের খরচ বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।

শ্রমিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তাঁদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য শুধু মজুরি বাড়ানো নয়; বরং বর্তমান আয় দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করা। তাঁদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা না হলে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি

শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। তাঁদের মতে, খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান আয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।

পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন, যাঁদের বড় একটি অংশের আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপন। তাই মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার কর্মপরিবেশেই নয়, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানার মালিকপক্ষ বা পোশাকশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সোমবার থেকে চলছে আন্দোলন

উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহজাহান হোসেন জানান, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ কয়েকটি দাবিতে সোমবার থেকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে বিক্ষোভ করছেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের এই আন্দোলন টানা কয়েক দিন ধরে চলছে। বুধবারও তাঁরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় উত্তরা এলাকার যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রুবেল হক বলেন, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বুধবার সকালে আজমপুর এলাকায় সড়কে নেমে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরে তাঁরা বিমানবন্দরের দিকে সরে যান। তখন বিমানবন্দর সড়কেও যান চলাচল বন্ধ ছিল।

অন্যদিকে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোর্শেদ আলম জানান, বুধবার দুপুর ১টার দিকেও শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন।

পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে উত্তরা ও বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। তবে অবরোধ কখন প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

জনভোগান্তি কমাতে প্রয়োজন দ্রুত সমাধান

টানা কয়েক দিনের সড়ক অবরোধের কারণে উত্তরার রাজলক্ষ্মী, আজমপুর ও বিমানবন্দর সড়ককেন্দ্রিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াত করেন। ফলে যান চলাচল বন্ধ থাকলে তার প্রভাব আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

একদিকে শ্রমিকেরা তাঁদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কারখানা মালিকপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে কার্যকর আলোচনা, মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে জনদুর্ভোগ কমাতে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর দাবিতে উত্তরায় পোশাকশ্রমিকদের টানা তৃতীয় দিনের বিক্ষোভ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। শ্রমিকদের দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয় পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!