জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন ঢাকার ২৫টি কর অঞ্চলের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিভাগের ১২ জেলার চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে শুধু ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের আবেদন করার সুযোগ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভাগের অন্য জেলার চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের দাবি, এ ধরনের শর্তের কারণে যোগ্য প্রার্থীরা সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সংশ্লিষ্ট শর্ত পুনর্বিবেচনা করে ঢাকা বিভাগের সব ১৩ জেলার যোগ্য প্রার্থীর আবেদন ও নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। একই সঙ্গে তাঁরা বিদ্যমান নিয়োগ শর্তকে বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক বলে দাবি করেছেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষে আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত নিয়ে ক্ষোভ
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, এনবিআরের আওতাধীন ঢাকার কয়েকটি কর অঞ্চলের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদের জন্য শুধু ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলার যোগ্য প্রার্থীরা এসব পদে আবেদন করতে পারছেন না।
তাঁদের দাবি, ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ১৩টি জেলার মধ্যে ঢাকা ছাড়া বাকি ১২ জেলার প্রার্থীদের জন্য আবেদনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে অনেক যোগ্য চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
আন্দোলনকারীরা বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জেলার ভিত্তিতে আবেদনের সুযোগ সীমিত করা হলে একই বিভাগের যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে অসম সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও আবেদনের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ
এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির প্রস্তুতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জেলার ভিত্তিতে আবেদনের সুযোগ সীমিত করায় তাঁদের অনেকের সেই প্রস্তুতি কাজে লাগানোর সুযোগ থাকছে না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, অতীতে ঢাকার বিভিন্ন কর অঞ্চলের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিভাগের সব জেলার প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হতো। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা জেলার বাইরের প্রার্থীদের বাদ দেওয়ায় তাঁরা হতাশ হয়েছেন।
তাঁদের মতে, নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত অন্যান্য শর্ত পূরণকারী প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। জেলা-নির্দিষ্ট শর্ত আরোপের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট করা দরকার।
সংবিধানের ২৭, ২৯ ও ৩১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ
স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৯ ও ৩১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ সীমিত করার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সমতা, সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার, ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমন কোনো শর্ত থাকা উচিত নয়, যা অযৌক্তিকভাবে যোগ্য প্রার্থীদের প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত করে। তাই তাঁরা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ শর্তের আইনগত ভিত্তি ও যৌক্তিকতা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অসাংবিধানিক কি না, তা নির্ধারণের জন্য বিজ্ঞপ্তির পূর্ণাঙ্গ ভাষা, সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, প্রযোজ্য আইন এবং কর্তৃপক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
সব ১৩ জেলার প্রার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি
মানববন্ধন ও স্মারকলিপিতে চাকরিপ্রার্থীরা ঢাকা বিভাগের সব ১৩ জেলার যোগ্য প্রার্থীর জন্য আবেদনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নিয়োগের শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী প্রার্থীরা ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন।
তাঁরা আরও দাবি করেন, যেসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে, সেগুলোর শর্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক। প্রয়োজনে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অন্য ১২ জেলার যোগ্য প্রার্থীদেরও আবেদনের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
চাকরিপ্রার্থীদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ না পেলে অনেকেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের একটি সম্ভাবনা হারাবেন। তাই নিয়োগ কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনার জন্য তাঁরা এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এনবিআরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় চাকরিপ্রার্থীরা
মানববন্ধন শেষে প্রতিনিধি দল এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে তাঁদের দাবিগুলো বিবেচনার অনুরোধ জানায়। চাকরিপ্রার্থীরা আশা করছেন, কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং যোগ্য প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
এ বিষয়ে এনবিআরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পরিবর্তনসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনটিতে যুক্ত করা প্রয়োজন। আপাতত চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, মানববন্ধন ও স্মারকলিপির মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করা চাকরিপ্রার্থী এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তির শর্তের আইনগত ভিত্তি, প্রযোজ্য নিয়োগবিধি এবং প্রার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগ পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে বলে আশা করছেন আন্দোলনকারীরা।

